কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি: ‘সবাই পারলে আমি কেন পারব না’ এই দৃঢ় প্রত্যয়ই দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হাফেজ মো. মারুফ উল্যাহকে বারবার ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি দিয়েছে।
অপমান, অবহেলা, কটূক্তি আর আর্থিক সংকট-সব প্রতিকূলতাকে জয় করে এবার তিনি এইচএসসি (আলিম) পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন। শুধু নিজের জন্য নয়, ভবিষ্যতে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করাই এখন তাঁর স্বপ্ন।
বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) কুড়িগ্রামের রাজারহাট ফাজিল ডিগ্রি মাদরাসা কেন্দ্রে অন্য পরীক্ষার্থীদের মতোই পরীক্ষার টেবিলে বসেন মারুফ। তবে তাঁর উত্তরপত্র লিখে দিচ্ছেন শ্রুতি -লেখক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ভাতিজি ছুম্মা আক্তার। চোখে দেখতে না পেলেও জ্ঞান অর্জনের অদম্য ইচ্ছাশক্তিই তাঁকে পৌঁছে দিয়েছে এই পর্যায়ে।
রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের বুজরুক নূরপুর গ্রামের বাসিন্দা মারুফ দুই ভাইয়ের মধ্যে ছোট। বাবা গোলজার হোসেন ২০১৯ সালে মারা যান। বড় ভাই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কর্মরত। মা শাহজাদি বেগমের উৎসাহ, পরিবারের সমর্থন এবং প্রতিবেশীদের সহযোগিতায় তিনি শিক্ষাজীবনের প্রতিটি ধাপ অতিক্রম করেছেন।
মারুফ বলেন, “চোখে দেখতে না পারায় আমাকে বাড়ির পাশের স্কুল থেকেই বের করে দেওয়া হয়েছিল। শিক্ষকরা বলেছিলেন, ‘একে দিয়ে পড়াশোনা হবে না। চোখে দেখো না, গ্রামার শিখে লাভ কী!’ সহপাঠীদের কটূক্তি, শিক্ষকদের অবহেলা-সবকিছু মিলিয়ে কখনো কখনো একটি দিনও একটি বছরের মতো মনে হতো। কিন্তু আমি থেমে থাকিনি। আমার কাছে পরীক্ষা নয়, জ্ঞান অর্জনই ছিল মূল লক্ষ্য।”
তিনি জানান, বাড়ির পাশের স্কুল ছাড়তে বাধ্য হওয়ার পর একটি হাফিজিয়া মাদরাসায় ভর্তি হন। এরপর ইবতেদায়ি পাস করে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার সময়ও তাঁকে নানা ধরনের অপমান সহ্য করতে হয়েছে। এমনকি এক শিক্ষক প্রাইভেট না পড়ায় ক্লাস পরীক্ষায় কম নম্বরও দিয়েছিলেন।
তবে ২০২২ সালে ফরিদপুর আব্দুল্লাহ দাখিল মাদরাসায় নবম শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার পর তাঁর জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আসে। সেখানে সুপার শাহ আলম, শিক্ষক নাজমুন নাহারসহ অন্য শিক্ষকরা তাঁকে বিশেষভাবে উৎসাহ ও দিকনির্দেশনা দেন।
মারুফ বলেন, “সুপার শাহ আলম স্যার সময় পেলেই আমাকে আলাদাভাবে গ্রামার ও অন্যান্য বিষয় বুঝিয়ে দিতেন। অথচ আমাকে ভর্তি করানোর জন্য তাকেও অনেক কথা শুনতে হয়েছিল। এরপর কুড়িগ্রাম আলিয়া কামিল মাদরাসায় ভর্তি হওয়ার পর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।”
নিজের ভবিষ্যৎ স্বপ্নের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, “আমি যেসব বাধার মুখোমুখি হয়েছি, সুযোগ পেলে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের যেন সেসব কষ্ট না পোহাতে হয়, সে জন্য কাজ করতে চাই। পড়াশোনার সময় আমি অনেক সহপাঠীকে বিনা পারিশ্রমিকে পড়িয়েছি। ভবিষ্যতেও প্রতিবন্ধীদের শিক্ষার জন্য কিছু করতে চাই।”
দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের উদ্দেশে তাঁর বার্তা, “খারাপ সময় একদিন না একদিন কেটে যাবে। কেউ আপনাকে অবহেলা করলে বা বললে যে পড়াশোনা করে লাভ নেই, সেই কথা বিশ^াস করা যাবে না। চাকরি না হলেও শিক্ষা আপনাকে আত্মমর্যাদা নিয়ে বাঁচতে শেখাবে, পরিবার গড়তে সাহায্য করবে এবং ভিক্ষাবৃত্তির বদলে সম্মানজনক জীবনযাপনের পথ দেখাবে।”
তিনি আরও বলেন, “আমি আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করি। এলাকার মানুষ আমাকে অনেক সহযোগিতা করেছেন। তবে কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমন আচরণের শিকার হয়েছি, যা আজও কষ্ট দেয়। একজন মানুষ ভালো কিছু করতে চাইলে তাকে ইতিবাচকভাবে দেখা উচিত।”
কুড়িগ্রাম আলিয়া কামিল মাদরাসার মোফাচ্ছির মাজিদুর রহমান বলেন, “প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও মারুফের শেখার আগ্রহ আমাদের মুগ্ধ করেছে। তিনি একজন মেধাবী ও পরিশ্রমী শিক্ষার্থী। উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে তিনি যেন নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারেন-এটাই আমাদের প্রত্যাশা। সরকার শিক্ষিত প্রতিবন্ধীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ালে অন্যরাও অনুপ্রাণিত হবে।”
রাজারহাট ফাজিল ডিগ্রি মাদরাসার অধ্যক্ষ মো. আব্দুল হাই জানান, এ বছর কেন্দ্রটিতে ৩২৯ জন পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ গ্রহন করেন। এর মধ্যে একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী পরীক্ষার্থী শ্রুতি-লেখকের সহায়তায় সুষ্ঠুভাবে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন। কেন্দ্রের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা নিশ্চিত করা হয়েছে।
আইএনবি/এম আ/বিভূঁইয়া
প্রিন্ট

৬৮ এসিল্যান্ড প্রত্যাহার, প্রজ্ঞাপন জারি 













