/* */
Dhaka , শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মানুষের শরীরে শূকরের কিডনি প্রতিস্থাপনের রেকর্ড: সচল ছিল ২৭১ দিন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:মানুষের শরীরে শূকরের কিডনি প্রতিস্থাপনের পর সেটি টানা ২৭১ দিন কাজ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে এ ধরনের প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে এটিই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে দীর্ঘ সময় কিডনি সচল থাকার ঘটনা বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা। যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাস জেনারেল ব্রিগহাম হাসপাতালের চিকিৎসকেরা এই কিডনি প্রতিস্থাপন করেন। রোগী টিম অ্যান্ড্রুজ জানান, শূকরের কিডনি তাঁকে নতুন করে আশার আলো দেখিয়েছিল এবং এর ফলে দীর্ঘ সময় হাসপাতালে গিয়ে ডায়ালাইসিস করার প্রয়োজনও পড়েনি।

চিকিৎসকদের মতে, মানুষের কিডনি পাওয়া পর্যন্ত শূকরের অঙ্গ সাময়িকভাবে ব্যবহার করে রোগীকে বাঁচিয়ে রাখার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে এই গবেষণায়। তবে শেষ পর্যন্ত শূকরের কিডনিটি কাজ করা বন্ধ করে দিলে সেটি শরীর থেকে বের করে নেওয়া হয়। এরপর অল্প সময় ডায়ালাইসিস করার পর অ্যান্ড্রুজ একজন মানবদাতার কিডনি পান। অন্য প্রজাতির প্রাণীর অঙ্গ মানুষের শরীরে প্রতিস্থাপনের এই পদ্ধতিকে জেনোট্রান্সপ্লান্টেশন বলা হয় এবং বিশ্বজুড়ে অঙ্গদাতার সংকট থাকায় এ নিয়ে গবেষণা চলছে।

যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে প্রায় ১ লাখ মানুষ কিডনি প্রতিস্থাপনের অপেক্ষায় থাকলেও দেশটিতে বছরে মাত্র ২৫ হাজার কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়। যুক্তরাজ্যেও ৭ হাজারের বেশি মানুষ কিডনি প্রতিস্থাপনের অপেক্ষায় রয়েছেন। অ্যান্ড্রুজকে চিকিৎসকেরা জানিয়েছিলেন যে কিডনি প্রতিস্থাপনের তালিকার শীর্ষে পৌঁছাতে তাঁর সাত বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে, অথচ ডায়ালাইসিসে থাকা মানুষের গড় আয়ু মাত্র পাঁচ বছর। অ্যান্ড্রুজ জানান, তাঁর হাতে সময় কম থাকায় বিষয়টি হতাশাজনক হয়ে উঠেছিল, তবে শূকরের কিডনি তাঁর কাছে ‘সুড়ঙ্গের শেষের আলো’ হিসেবে দেখা দিয়েছিল।

অ্যান্ড্রুজের শরীরে প্রতিস্থাপন করা কিডনিটি নেওয়া হয়েছিল জেনেটিকভাবে পরিবর্তিত ইউকাটান মিনিয়েচার জাতের একটি শূকর থেকে। সাধারণ শূকরের কিডনি সরাসরি মানুষের শরীরে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়, কারণ মানুষের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা সেটিকে বাইরের অঙ্গ হিসেবে শনাক্ত করে আক্রমণ করে। এ কারণে গবেষকেরা শূকরের জিনে মোট ৬৯টি পরিবর্তন করেন, যার মাধ্যমে মানুষের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা সহজে শনাক্ত করতে পারে এমন বৈশিষ্ট্যগুলো সরিয়ে ফেলা হয় এবং কিছু মানব জিন যুক্ত করা হয়। পাশাপাশি শূকরের ডিএনএ-তে থাকা ভাইরাসগুলোর ঝুঁকিও কমানো হয়।

টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়ে ৬৬ বছর বয়সী টিম অ্যান্ড্রুজের কিডনি বিকল হতে শুরু করলে ২০২৫ সালের ২৫ জানুয়ারি তাঁর শরীরে এই শূকরের কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়। চিকিৎসকদের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিস্থাপনের পরই কিডনিটি সঙ্গে সঙ্গে কাজ শুরু করে এবং মোট ২৭১ দিন সচল থাকে। ওই বছরের অক্টোবরে সেটি শরীর থেকে অপসারণ করার পর অ্যান্ড্রুজকে ৮২ দিন ডায়ালাইসিস করতে হয় এবং চলতি বছরের জানুয়ারিতে তিনি একজন মানবদাতার কিডনি পান। বর্তমানে নতুন মানব কিডনিটি তাঁর শরীরে ভালোভাবে কাজ করছে।

ম্যাস জেনারেল ব্রিগহামের সেন্টার ফর ট্রান্সপ্লান্টেশন সায়েন্সেসের চিকিৎসক লিওনার্দো রিয়েলা জানান, অঙ্গের সংকটের কারণে চিকিৎসাবিজ্ঞান একটি সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যেসব রোগীর জীবিত কোনো অঙ্গদাতা নেই, তাঁদের জন্য জেনোট্রান্সপ্লান্টেশন ডায়ালাইসিস এড়িয়ে সরাসরি প্রতিস্থাপনের বিকল্প হতে পারে বলে তিনি মনে করেন। তবে অ্যান্ড্রুজের শরীরে প্রতিস্থাপিত কিডনিটি পুরোপুরি নিখুঁত ছিল না। প্রতিস্থাপনের পর রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা সেটিকে প্রত্যাখ্যান করার লক্ষণ দেখা দিলে ওষুধের মাত্রা পরিবর্তন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। পরবর্তীতে প্রায় ছয় মাস পর কিডনিটির রক্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে, প্রদাহ দেখা দেয় এবং ধীরে ধীরে কার্যক্ষমতা কমে যায়। শূকরের কিডনিকে আক্রমণ করছে এমন কোনো অ্যান্টিবডির লক্ষণ না পাওয়ায় কিডনিটি কেন কাজ করা বন্ধ করেছিল, তা এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী দ্য ল্যানসেট-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে চিকিৎসকেরা উল্লেখ করেছেন যে, এই ঘটনা মানুষের মধ্যে কিডনি প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে জেনোট্রান্সপ্লান্টেশনের অপার সম্ভাবনার পাশাপাশি এখনো রয়ে যাওয়া বিভিন্ন চ্যালেঞ্জকেও স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে।

 

 

আইএনবি/বিভূঁইয়া


প্রিন্ট
ট্যাগ :
জনপ্রিয় সংবাদ

মানুষের শরীরে শূকরের কিডনি প্রতিস্থাপনের রেকর্ড: সচল ছিল ২৭১ দিন

মানুষের শরীরে শূকরের কিডনি প্রতিস্থাপনের রেকর্ড: সচল ছিল ২৭১ দিন

আপডেটের সময় : ০৩:৫৩:৩৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:মানুষের শরীরে শূকরের কিডনি প্রতিস্থাপনের পর সেটি টানা ২৭১ দিন কাজ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে এ ধরনের প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে এটিই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে দীর্ঘ সময় কিডনি সচল থাকার ঘটনা বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা। যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাস জেনারেল ব্রিগহাম হাসপাতালের চিকিৎসকেরা এই কিডনি প্রতিস্থাপন করেন। রোগী টিম অ্যান্ড্রুজ জানান, শূকরের কিডনি তাঁকে নতুন করে আশার আলো দেখিয়েছিল এবং এর ফলে দীর্ঘ সময় হাসপাতালে গিয়ে ডায়ালাইসিস করার প্রয়োজনও পড়েনি।

চিকিৎসকদের মতে, মানুষের কিডনি পাওয়া পর্যন্ত শূকরের অঙ্গ সাময়িকভাবে ব্যবহার করে রোগীকে বাঁচিয়ে রাখার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে এই গবেষণায়। তবে শেষ পর্যন্ত শূকরের কিডনিটি কাজ করা বন্ধ করে দিলে সেটি শরীর থেকে বের করে নেওয়া হয়। এরপর অল্প সময় ডায়ালাইসিস করার পর অ্যান্ড্রুজ একজন মানবদাতার কিডনি পান। অন্য প্রজাতির প্রাণীর অঙ্গ মানুষের শরীরে প্রতিস্থাপনের এই পদ্ধতিকে জেনোট্রান্সপ্লান্টেশন বলা হয় এবং বিশ্বজুড়ে অঙ্গদাতার সংকট থাকায় এ নিয়ে গবেষণা চলছে।

যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে প্রায় ১ লাখ মানুষ কিডনি প্রতিস্থাপনের অপেক্ষায় থাকলেও দেশটিতে বছরে মাত্র ২৫ হাজার কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়। যুক্তরাজ্যেও ৭ হাজারের বেশি মানুষ কিডনি প্রতিস্থাপনের অপেক্ষায় রয়েছেন। অ্যান্ড্রুজকে চিকিৎসকেরা জানিয়েছিলেন যে কিডনি প্রতিস্থাপনের তালিকার শীর্ষে পৌঁছাতে তাঁর সাত বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে, অথচ ডায়ালাইসিসে থাকা মানুষের গড় আয়ু মাত্র পাঁচ বছর। অ্যান্ড্রুজ জানান, তাঁর হাতে সময় কম থাকায় বিষয়টি হতাশাজনক হয়ে উঠেছিল, তবে শূকরের কিডনি তাঁর কাছে ‘সুড়ঙ্গের শেষের আলো’ হিসেবে দেখা দিয়েছিল।

অ্যান্ড্রুজের শরীরে প্রতিস্থাপন করা কিডনিটি নেওয়া হয়েছিল জেনেটিকভাবে পরিবর্তিত ইউকাটান মিনিয়েচার জাতের একটি শূকর থেকে। সাধারণ শূকরের কিডনি সরাসরি মানুষের শরীরে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়, কারণ মানুষের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা সেটিকে বাইরের অঙ্গ হিসেবে শনাক্ত করে আক্রমণ করে। এ কারণে গবেষকেরা শূকরের জিনে মোট ৬৯টি পরিবর্তন করেন, যার মাধ্যমে মানুষের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা সহজে শনাক্ত করতে পারে এমন বৈশিষ্ট্যগুলো সরিয়ে ফেলা হয় এবং কিছু মানব জিন যুক্ত করা হয়। পাশাপাশি শূকরের ডিএনএ-তে থাকা ভাইরাসগুলোর ঝুঁকিও কমানো হয়।

টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়ে ৬৬ বছর বয়সী টিম অ্যান্ড্রুজের কিডনি বিকল হতে শুরু করলে ২০২৫ সালের ২৫ জানুয়ারি তাঁর শরীরে এই শূকরের কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়। চিকিৎসকদের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিস্থাপনের পরই কিডনিটি সঙ্গে সঙ্গে কাজ শুরু করে এবং মোট ২৭১ দিন সচল থাকে। ওই বছরের অক্টোবরে সেটি শরীর থেকে অপসারণ করার পর অ্যান্ড্রুজকে ৮২ দিন ডায়ালাইসিস করতে হয় এবং চলতি বছরের জানুয়ারিতে তিনি একজন মানবদাতার কিডনি পান। বর্তমানে নতুন মানব কিডনিটি তাঁর শরীরে ভালোভাবে কাজ করছে।

ম্যাস জেনারেল ব্রিগহামের সেন্টার ফর ট্রান্সপ্লান্টেশন সায়েন্সেসের চিকিৎসক লিওনার্দো রিয়েলা জানান, অঙ্গের সংকটের কারণে চিকিৎসাবিজ্ঞান একটি সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যেসব রোগীর জীবিত কোনো অঙ্গদাতা নেই, তাঁদের জন্য জেনোট্রান্সপ্লান্টেশন ডায়ালাইসিস এড়িয়ে সরাসরি প্রতিস্থাপনের বিকল্প হতে পারে বলে তিনি মনে করেন। তবে অ্যান্ড্রুজের শরীরে প্রতিস্থাপিত কিডনিটি পুরোপুরি নিখুঁত ছিল না। প্রতিস্থাপনের পর রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা সেটিকে প্রত্যাখ্যান করার লক্ষণ দেখা দিলে ওষুধের মাত্রা পরিবর্তন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। পরবর্তীতে প্রায় ছয় মাস পর কিডনিটির রক্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে, প্রদাহ দেখা দেয় এবং ধীরে ধীরে কার্যক্ষমতা কমে যায়। শূকরের কিডনিকে আক্রমণ করছে এমন কোনো অ্যান্টিবডির লক্ষণ না পাওয়ায় কিডনিটি কেন কাজ করা বন্ধ করেছিল, তা এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী দ্য ল্যানসেট-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে চিকিৎসকেরা উল্লেখ করেছেন যে, এই ঘটনা মানুষের মধ্যে কিডনি প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে জেনোট্রান্সপ্লান্টেশনের অপার সম্ভাবনার পাশাপাশি এখনো রয়ে যাওয়া বিভিন্ন চ্যালেঞ্জকেও স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে।

 

 

আইএনবি/বিভূঁইয়া


প্রিন্ট