ঢাকা , মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬, ২৩ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জানাজায় বেশি মানুষ হলে কী উপকার?

প্রতীকী ছবি

ধর্ম ডেস্ক: মৃত মুসলমানের জন্য জানাজার নামাজ ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এটি শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং মৃত ব্যক্তির জন্য জীবিত মুসলমানদের সম্মিলিতভাবে আল্লাহর কাছে ক্ষমা, রহমত ও মাগফিরাতের আবেদন। ইসলামে জানাজার গুরুত্ব এতটাই বেশি যে এতে অংশগ্রহণকারী মুসল্লির সংখ্যাকেও হাদিসে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

১০০ মুসল্লির দোয়া কবুল হওয়ার সুসংবাদ

হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, কোনো মৃত ব্যক্তির জানাজায় যদি একশজন মুসলমান অংশ নেন এবং সবাই আন্তরিকভাবে তার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন, তাহলে আল্লাহ তাদের সেই সুপারিশ কবুল করেন। (সহিহ মুসলিম: ২০৮৭) এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, বেশি সংখ্যক ঈমানদার মুসলমানের সম্মিলিত দোয়া মৃত ব্যক্তির জন্য রহমত লাভের গুরুত্বপূর্ণ একটি মাধ্যম।

৪০ জন মুমিনের দোয়াও যথেষ্ট

আরেকটি সহিহ হাদিসে হজরত আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, কোনো মুসলমানের জানাজায় যদি এমন চল্লিশজন মানুষ উপস্থিত থাকেন যারা আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করেন না, তবে আল্লাহ তাদের সুপারিশও গ্রহণ করেন। (সহিহ মুসলিম: ২০৮৮)

এখানে সংখ্যার চেয়ে অংশগ্রহণকারীদের বিশুদ্ধ ঈমান ও আন্তরিকতার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

৪০ ও ১০০ দুই হাদিসের মধ্যে কি বিরোধ রয়েছে?

প্রথম দৃষ্টিতে দুটি হাদিসে ভিন্ন সংখ্যা উল্লেখ থাকায় অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে। তবে ইসলামী গবেষকদের মতে, এতে কোনো সাংঘর্ষিক বিষয় নেই। অনেক মুহাদ্দিস ব্যাখ্যা করেছেন, প্রথমে একশজনের কথা বলা হলেও পরে আল্লাহ তাআলা উম্মতের জন্য বিষয়টি সহজ করে চল্লিশজনের দোয়াকেও এই সুসংবাদের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। অর্থাৎ, মূল শিক্ষা হলো ঈমানদার মুসলমানদের আন্তরিক দোয়া মৃত ব্যক্তির জন্য অত্যন্ত মূল্যবান।

বেশি মানুষ মানেই কি নিশ্চিত মাগফিরাত?

হাদিসে সুসংবাদ থাকলেও এটি কোনো ব্যক্তির জান্নাত বা জাহান্নামের চূড়ান্ত ফয়সালা নয়। ইসলামের আকিদা অনুযায়ী মানুষের শেষ পরিণতির সিদ্ধান্ত একমাত্র আল্লাহ তাআলার হাতে। তিনি প্রত্যেক মানুষের ঈমান, আমল ও অন্তরের অবস্থা সম্পর্কে সর্বাধিক অবগত। তাই এসব হাদিসকে নিশ্চিত রায় হিসেবে নয়, বরং আল্লাহর অসীম রহমতের আশাব্যঞ্জক ঘোষণা হিসেবে বুঝতে হবে।

মৃত ব্যক্তির ভালো পরিচিতিও গুরুত্বপূর্ণ

শুধু জানাজায় মানুষের উপস্থিতিই নয়, মৃত ব্যক্তি সম্পর্কে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত ভালো মন্তব্যও ইসলামে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। সহিহ বুখারির বর্ণনায় এসেছে, এক ব্যক্তির জানাজা নিয়ে যাওয়ার সময় সাহাবায়ে কেরাম তার প্রশংসা করলে রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘ওয়াজাবাত’(অবধারিত হয়ে গেছে)। পরে আরেক ব্যক্তির সমালোচনা করা হলে তিনি একই শব্দ ব্যবহার করেন। এরপর ব্যাখ্যা করে বলেন, মানুষ পৃথিবীতে আল্লাহর সাক্ষীস্বরূপ। (সহিহ বুখারি: ১৩৬৭)

এ থেকে বোঝা যায়, নেককার মানুষের জন্য সমাজে ভালো সাক্ষ্য সৃষ্টি হওয়াও আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহের একটি নিদর্শন।

লোক কম হলে কী করবেন?

সব সময় জানাজায় বিপুলসংখ্যক মানুষ উপস্থিত হওয়া সম্ভব হয় না। এমন অবস্থায় রাসুলুল্লাহ (স.) উপস্থিত মুসল্লিদের অন্তত তিনটি কাতারে দাঁড়ানোর প্রতি উৎসাহ দিয়েছেন। হাদিসে এসেছে, কোনো মৃত ব্যক্তির জানাজায় তিনটি কাতার হলে তার জন্য জান্নাতের সুসংবাদ রয়েছে। (সুনানে আবু দাউদ: ৩১৬৬; জামে তিরমিজি: ১০২৮)

অবশ্যই এর অর্থ আল্লাহর রহমতের সুসংবাদ; চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত একমাত্র আল্লাহর।

জানাজাকে লোকদেখানোর মাধ্যম না বানানো

জানাজায় মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি প্রশংসনীয় হলেও এটি কখনো সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শনের বিষয় হতে পারে না। ইসলামের শিক্ষা হলো, জানাজার মূল উদ্দেশ্য মৃত ব্যক্তির জন্য ইখলাসের সঙ্গে দোয়া করা এবং আল্লাহর কাছে তার ক্ষমা কামনা করা।

জানাজায় অংশগ্রহণকারীরও রয়েছে বিরাট প্রতিদান

জানাজার নামাজ শুধু মৃত ব্যক্তির জন্য উপকারী নয়; এতে অংশগ্রহণকারীর জন্যও রয়েছে বড় সওয়াব। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, যে ব্যক্তি জানাজার নামাজ আদায় করে সে এক কিরাত সওয়াব লাভ করে। আর যে ব্যক্তি দাফন পর্যন্ত সঙ্গে থাকে, সে দুই কিরাত সওয়াব পায়। তিনি আরও বলেন, প্রতিটি কিরাত উহুদ পাহাড়সম বিশাল। (সহিহ বুখারি; সহিহ মুসলিম)

জানাজার নামাজ ফরজে কিফায়া। তাই কোনো মুসলমানের মৃত্যুসংবাদ জানার পর সামর্থ্য থাকলে তার জানাজায় অংশ নেওয়া, তার জন্য আন্তরিকভাবে মাগফিরাতের দোয়া করা এবং তার ভালো দিকগুলো স্মরণ করা একজন মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

সবশেষে, জানাজায় ৪০ বা ১০০ মুসল্লির প্রসঙ্গ সংখ্যার প্রতিযোগিতা নয়; বরং আন্তরিক ঈমান, নিষ্ঠার সঙ্গে করা দোয়া এবং আল্লাহর রহমতের আশার বার্তা। তাই সুযোগ হলে মুসলমানের জানাজায় শরিক হওয়া, মৃতের জন্য দোয়া করা এবং ইসলামের এই গুরুত্বপূর্ণ হক আদায়ে সচেষ্ট হওয়া প্রত্যেক মুমিনের কর্তব্য।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে মৃত মুসলমানদের জন্য ইখলাসের সঙ্গে দোয়া করার এবং ঈমানের সঙ্গে উত্তম পরিণতি লাভের তাওফিক দান করুন। আমিন।

 

আইএনবি/বিভূঁইয়া


প্রিন্ট
Tag :

জানাজায় বেশি মানুষ হলে কী উপকার?

আপডেট সময় ০৩:৪৩:৪৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ জুলাই ২০২৬

ধর্ম ডেস্ক: মৃত মুসলমানের জন্য জানাজার নামাজ ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এটি শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং মৃত ব্যক্তির জন্য জীবিত মুসলমানদের সম্মিলিতভাবে আল্লাহর কাছে ক্ষমা, রহমত ও মাগফিরাতের আবেদন। ইসলামে জানাজার গুরুত্ব এতটাই বেশি যে এতে অংশগ্রহণকারী মুসল্লির সংখ্যাকেও হাদিসে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

১০০ মুসল্লির দোয়া কবুল হওয়ার সুসংবাদ

হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, কোনো মৃত ব্যক্তির জানাজায় যদি একশজন মুসলমান অংশ নেন এবং সবাই আন্তরিকভাবে তার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন, তাহলে আল্লাহ তাদের সেই সুপারিশ কবুল করেন। (সহিহ মুসলিম: ২০৮৭) এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, বেশি সংখ্যক ঈমানদার মুসলমানের সম্মিলিত দোয়া মৃত ব্যক্তির জন্য রহমত লাভের গুরুত্বপূর্ণ একটি মাধ্যম।

৪০ জন মুমিনের দোয়াও যথেষ্ট

আরেকটি সহিহ হাদিসে হজরত আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, কোনো মুসলমানের জানাজায় যদি এমন চল্লিশজন মানুষ উপস্থিত থাকেন যারা আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করেন না, তবে আল্লাহ তাদের সুপারিশও গ্রহণ করেন। (সহিহ মুসলিম: ২০৮৮)

এখানে সংখ্যার চেয়ে অংশগ্রহণকারীদের বিশুদ্ধ ঈমান ও আন্তরিকতার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

৪০ ও ১০০ দুই হাদিসের মধ্যে কি বিরোধ রয়েছে?

প্রথম দৃষ্টিতে দুটি হাদিসে ভিন্ন সংখ্যা উল্লেখ থাকায় অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে। তবে ইসলামী গবেষকদের মতে, এতে কোনো সাংঘর্ষিক বিষয় নেই। অনেক মুহাদ্দিস ব্যাখ্যা করেছেন, প্রথমে একশজনের কথা বলা হলেও পরে আল্লাহ তাআলা উম্মতের জন্য বিষয়টি সহজ করে চল্লিশজনের দোয়াকেও এই সুসংবাদের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। অর্থাৎ, মূল শিক্ষা হলো ঈমানদার মুসলমানদের আন্তরিক দোয়া মৃত ব্যক্তির জন্য অত্যন্ত মূল্যবান।

বেশি মানুষ মানেই কি নিশ্চিত মাগফিরাত?

হাদিসে সুসংবাদ থাকলেও এটি কোনো ব্যক্তির জান্নাত বা জাহান্নামের চূড়ান্ত ফয়সালা নয়। ইসলামের আকিদা অনুযায়ী মানুষের শেষ পরিণতির সিদ্ধান্ত একমাত্র আল্লাহ তাআলার হাতে। তিনি প্রত্যেক মানুষের ঈমান, আমল ও অন্তরের অবস্থা সম্পর্কে সর্বাধিক অবগত। তাই এসব হাদিসকে নিশ্চিত রায় হিসেবে নয়, বরং আল্লাহর অসীম রহমতের আশাব্যঞ্জক ঘোষণা হিসেবে বুঝতে হবে।

মৃত ব্যক্তির ভালো পরিচিতিও গুরুত্বপূর্ণ

শুধু জানাজায় মানুষের উপস্থিতিই নয়, মৃত ব্যক্তি সম্পর্কে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত ভালো মন্তব্যও ইসলামে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। সহিহ বুখারির বর্ণনায় এসেছে, এক ব্যক্তির জানাজা নিয়ে যাওয়ার সময় সাহাবায়ে কেরাম তার প্রশংসা করলে রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘ওয়াজাবাত’(অবধারিত হয়ে গেছে)। পরে আরেক ব্যক্তির সমালোচনা করা হলে তিনি একই শব্দ ব্যবহার করেন। এরপর ব্যাখ্যা করে বলেন, মানুষ পৃথিবীতে আল্লাহর সাক্ষীস্বরূপ। (সহিহ বুখারি: ১৩৬৭)

এ থেকে বোঝা যায়, নেককার মানুষের জন্য সমাজে ভালো সাক্ষ্য সৃষ্টি হওয়াও আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহের একটি নিদর্শন।

লোক কম হলে কী করবেন?

সব সময় জানাজায় বিপুলসংখ্যক মানুষ উপস্থিত হওয়া সম্ভব হয় না। এমন অবস্থায় রাসুলুল্লাহ (স.) উপস্থিত মুসল্লিদের অন্তত তিনটি কাতারে দাঁড়ানোর প্রতি উৎসাহ দিয়েছেন। হাদিসে এসেছে, কোনো মৃত ব্যক্তির জানাজায় তিনটি কাতার হলে তার জন্য জান্নাতের সুসংবাদ রয়েছে। (সুনানে আবু দাউদ: ৩১৬৬; জামে তিরমিজি: ১০২৮)

অবশ্যই এর অর্থ আল্লাহর রহমতের সুসংবাদ; চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত একমাত্র আল্লাহর।

জানাজাকে লোকদেখানোর মাধ্যম না বানানো

জানাজায় মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি প্রশংসনীয় হলেও এটি কখনো সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শনের বিষয় হতে পারে না। ইসলামের শিক্ষা হলো, জানাজার মূল উদ্দেশ্য মৃত ব্যক্তির জন্য ইখলাসের সঙ্গে দোয়া করা এবং আল্লাহর কাছে তার ক্ষমা কামনা করা।

জানাজায় অংশগ্রহণকারীরও রয়েছে বিরাট প্রতিদান

জানাজার নামাজ শুধু মৃত ব্যক্তির জন্য উপকারী নয়; এতে অংশগ্রহণকারীর জন্যও রয়েছে বড় সওয়াব। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, যে ব্যক্তি জানাজার নামাজ আদায় করে সে এক কিরাত সওয়াব লাভ করে। আর যে ব্যক্তি দাফন পর্যন্ত সঙ্গে থাকে, সে দুই কিরাত সওয়াব পায়। তিনি আরও বলেন, প্রতিটি কিরাত উহুদ পাহাড়সম বিশাল। (সহিহ বুখারি; সহিহ মুসলিম)

জানাজার নামাজ ফরজে কিফায়া। তাই কোনো মুসলমানের মৃত্যুসংবাদ জানার পর সামর্থ্য থাকলে তার জানাজায় অংশ নেওয়া, তার জন্য আন্তরিকভাবে মাগফিরাতের দোয়া করা এবং তার ভালো দিকগুলো স্মরণ করা একজন মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

সবশেষে, জানাজায় ৪০ বা ১০০ মুসল্লির প্রসঙ্গ সংখ্যার প্রতিযোগিতা নয়; বরং আন্তরিক ঈমান, নিষ্ঠার সঙ্গে করা দোয়া এবং আল্লাহর রহমতের আশার বার্তা। তাই সুযোগ হলে মুসলমানের জানাজায় শরিক হওয়া, মৃতের জন্য দোয়া করা এবং ইসলামের এই গুরুত্বপূর্ণ হক আদায়ে সচেষ্ট হওয়া প্রত্যেক মুমিনের কর্তব্য।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে মৃত মুসলমানদের জন্য ইখলাসের সঙ্গে দোয়া করার এবং ঈমানের সঙ্গে উত্তম পরিণতি লাভের তাওফিক দান করুন। আমিন।

 

আইএনবি/বিভূঁইয়া


প্রিন্ট