এমডি বাবুল ভূঁইয়া:
সিগারেটের ধোঁয়াগুলো কুণ্ডলী পাকিয়ে শূন্যে মিলিয়ে যাচ্ছে, ঠিক যেমন আমার স্বপ্নগুলো মিলিয়ে গেছে। আমি ভাবছি এখন কী করা যায়। এমন সময় মসজিদগুলো থেকে মুয়াজ্জিনের ফজরের আজানের সুমধুর ধ্বনি আমার কানে এল। মনটা এক মুহূর্তের জন্য শান্ত হলো। বাথরুমে গিয়ে ওজু করে ফজরের নামাজটা পড়লাম। এক অদ্ভুত স্থিরতা কাজ করছে এখন মাথায়। দিবাকে একটি শব্দও না বলে, ওর কোনো দিকে না তাকিয়েই আমি বাসা থেকে বের হয়ে এলাম।
দিবার বাসা থেকে চলে আসার পর প্রায় এক সপ্তাহ কেটে গেছে। আমি ইচ্ছে করেই কোনো যোগাযোগ করিনি। মনে মনে স্থির করলাম—একে ডিভোর্স দিয়ে দেব। যেহেতু এখনো আমাদের সংসারে কোনো সন্তান আসেনি, তাই দিবার মতো বিষাক্ত আপদ থেকে এখনই মুক্তি পাওয়া শ্রেয়। এই মেয়ে চারিত্রিকভাবে কতটা নিচ, তা এখন হাড়হিম করা সত্য হয়ে আমার সামনে দাঁড়িয়েছে।
এখন শিলার কথা খুব মনে পড়ছে। হয়তো এসব কারণেই শিলা চায়নি দিবাকে আমি বিয়ে করি। শিলা দিবার বেস্ট ফ্রেন্ড হওয়ায় ওর সব নগ্ন ইতিহাস হয়তো আগে থেকেই জানত। আর যা-ই হোক, একজন চরিত্রহীন মেয়ের সাথে সংসার করে সারাজীবন ধুঁকে ধুঁকে মরার চেয়ে মুক্ত হওয়া অনেক ভালো। কষ্ট হবে জানি, কিন্তু সেই কষ্ট পচে মরার চেয়ে অনেক সম্মানের। প্রশ্ন একটাই—আমি অভিভাবক ছাড়া বিয়ে করেছি। আমার বংশে আজ পর্যন্ত কেউ বউ ছাড়েনি, এমনকি কেউ দ্বিতীয় বিয়েও করেনি। এই সমাজ আর আত্মীয়-স্বজনরা আমাকে কী মনে করবে? এক অজানা সিদ্ধান্তহীনতার তপ্ত বালুচরে আমি একা দাঁড়িয়ে কষ্ট পাচ্ছি। এসব কথা কাউকে শেয়ার করার মতো নয়। আমি বুঝলাম, আমি অজানার এক অন্ধকারে পাড়ি দিচ্ছি।
মাঝে মাঝে দিবার বাসার সেই আপার সাথে ফোনে ওর খোঁজখবর নিচ্ছি। প্রতিদিনই সেই পরকীয়া প্রেমিকের সাথে রাত জেগে কথা বলছে সে। আপা আমাকে আড়ালে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “জয় ভাই, এই মেয়েকে দিয়ে আপনি কোনোদিন সুখ পাবেন না। আপনাদের কোনো সন্তান হয়নি, এখনই উপযুক্ত সময় একটা সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার।”
আমি শুধু শুনলাম, আপাকে বললাম না যে আমি আগেই সব ঠিক করে নিয়েছি। শুধু অনুরোধ করলাম, “আপা, আপনি আমাকে দিবার প্রতিদিনের আপডেট জানাবেন। কখন বাসায় ফেরে, কোন দিন ফেরে না—সব। বাকিটা আমি দেখে নেব।”
আপার সাথে কথা বলার পর থেকে আমি প্রায়ই দিবার অফিসের সামনে যেতাম। যদিও অফিসের ভেতরে সে কী করছে তা জানা অসম্ভব, কিন্তু আমি ওর চালচলন আবিষ্কার করতে চাইছিলাম। একদিন বিধাতা যেন অলৌকিক এক সুযোগ আমার সামনে এনে দিলেন। দিবার অফিসের এক মেয়ের সাথে আমার পরিচয় হলো—মেয়েটার নাম বর্ষা।
আমি দিবার জন্য রাস্তার মোড়ে অপেক্ষা করছিলাম, ঠিক সেই সময় বর্ষাও অফিসে যাচ্ছিল। রিকশা ভাড়া মেটানোর সময় ওর কাছে কোনো খুচরা টাকা ছিল না, আর রিকশাওয়ালার কাছেও কোনো ভাঙতি ছিল না। দুজনের মধ্যে কথা কাটাকাটি দেখে আমি সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।
রিকশাওয়ালার গলায় বিরক্তি, “মামা, চল্লিশ টেকা ভাড়া। আমারে পাঁচশ টেকার নোট দিছে! আপনিই কন, এতো সকালে আমি ভাঙতি পামু কই?”
আমি হাসিমুখে পকেট থেকে ভাড়াটা মিটিয়ে দিলাম। বর্ষা তখন কুণ্ঠিত হয়ে বলল, “ভাইয়া, আমি এই অফিসেই চাকরি করি। আপনার ফোন নম্বরটা দেন, আমি টাকাটা পাঠিয়ে দেব।”
আমি ভদ্রভাবে বললাম, “টাকা ফেরত দিতে হবে না বোন। তুমি তো আমার ছোট বোনের মতো। ছোট বোনকে কিছু দিলে কি ফেরত নিতে হয়?”
সেদিন থেকেই বর্ষার সাথে আমার যোগাযোগ শুরু। ওর ফোন নম্বরটা পেলাম। সেদিন অফিস টাইম শেষ হয়ে গেলেও আমি দিবাকে দেখতে পেলাম না। বাসার আপাকে ফোন দিয়ে জানলাম—দিবা সকালেই অফিসের কথা বলে বের হয়ে গেছে। তার মানে সে অফিস ফাঁকি দিয়ে কোথাও রঙ্গলীলায় মেতেছে!
বর্ষার সাথে আমার ঘনিষ্ঠতা বাড়তে লাগল। কিন্তু আমার এই ঘনিষ্ঠ হওয়ার পেছনের মূল উদ্দেশ্য তখনও সে বুঝতে পারেনি। একদিন আমি ওকে বললাম, “বর্ষা, তুমি কি আমার একটা উপকার করবে?”
বর্ষা হাসিমুখে বলল, “কী উপকার ভাইয়া?”
আমি সরাসরি জিজ্ঞেস করলাম, “তোমাদের অফিসে দিবা নামে একটা মেয়ে চাকরি করে, ওকে চেনো?”
সে সহজভাবে উত্তর দিল, “হ্যাঁ চিনি তো ভাইয়া! ও তো আমার পাশের ডেস্কে বসেই কাজ করে। শুধু তাই না, আমি তো দিবার আপুর হাজবেন্ডকেও চিনি! উনার সাথে ফোনে আমার প্রায়ই কথা হয়।”
বর্ষার মুখে এই কথা শোনার পর আমার পায়ের তলার মাটি সরে গেল। সারা শরীর রাগে রি রি করে উঠল। দিবা অফিসে গিয়েও পারভেজের সাথে কথা বলে! শুধু তাই না, পারভেজকে নিজের ‘স্বামী’ পরিচয় দিয়ে কলিগদের সাথে গল্প করে আর দেমাক দেখায়! আসলেই সে এক জঘন্য নষ্ট নারী। আমি এতদিন তবে মরিচিকার পেছনে ছুটছিলাম?
আমার নীরবতা দেখে বর্ষা বলল, “ভাইয়া? বললেন না তো কী উপকার করতে হবে?”
আমি আর কোনো বাহানা না করে সোজাসুজি বলে দিলাম, “বর্ষা, তুমি যার সাথে কথা বলেছ সে দিবার হাজবেন্ড নয়। দিবার আসল হাজবেন্ড হলাম আমি।”
আমার কথা শুনে বর্ষা থতমত খেয়ে গেল। আমি ওকে বুঝিয়ে বললাম যে আমাদের মাঝে একটু মান-অভিমান চলছে, তাই হয়তো ও মজা করেছে। আমি দিবাকে ছোট করতে চাইনি, কিন্তু বর্ষা অবাক হয়ে বলল, “ভাইয়া, ফান করলেও তো এটা একদিনের বিষয় নয়! আমরা প্রায়ই লাঞ্চ টাইমে দিবা আপুর স্বামীর সাথে কথা বলি। বলতে গেলে প্রতিদিনই! প্রথমে আপু কথা বলে, তারপর আমরা একটু কথা বলে দুস্টুমি করি। কিন্তু আপনি কি আমার কাছে কোনো কিছু লুকাচ্ছেন?”
বর্ষার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আর আমার নীরবতা এক চরম সত্যের ইঙ্গিত দিচ্ছিল। বর্ষা শান্ত গলায় বলল, “আমি বুঝতে পেরেছি ভাইয়া। আপনি আমাকে বোন বলে ডেকেছেন, আজ থেকে সত্যিই আপনি আমার বড় ভাই। আপনার উপকার করতে পারলে আমি শান্তি পাব।”
আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, “তোমাকে তেমন কিছুই করতে হবে না বোন। শুধু দিবা কখন অফিসে আসে আর কখন যায়—এই আপডেটটুকু দিলেই হবে। এর বেশি কিছু লাগবে না।”
চলবে-
আইএনবি নিউজ