ঢাকা , মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬, ১৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিশাল ম্যাগমা ব্যবস্থার সন্ধান পাওয়া গেল মঙ্গল গ্রহে

সংগৃহীত ছবি

প্রযুক্তি ডেস্ক: মঙ্গল গ্রহের গভীরে বিশাল ও দীর্ঘস্থায়ী ম্যাগমা (গলিত লাভা) ব্যবস্থার সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা।

নাসার ‘ইনসাইট’ মিশনের তথ্য বিশ্লেষণ করে পাওয়া এই আবিষ্কার মঙ্গলের ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করছে। একই সঙ্গে সৌরজগতের বাইরের পাথুরে গ্রহগুলোতেও প্রাণের উপযোগী পরিবেশ থাকার সম্ভাবনা আগের চেয়ে আরও জোরালো হয়েছে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্ট জানিয়েছে, নতুন গবেষণায় মঙ্গলের ভূত্বকের গভীরে একটি বড় ও লুকিয়ে থাকা ম্যাগমা ব্যবস্থার প্রমাণ মিলেছে। গবেষকদের মতে, এটি ইঙ্গিত দেয় যে একসময় মঙ্গলেও পৃথিবীর মতো দীর্ঘস্থায়ী ম্যাগমা ব্যবস্থা সক্রিয় ছিল।

এ আবিষ্কারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, মঙ্গলে পৃথিবীর মতো প্লেট টেকটোনিক্স বা ভূত্বকীয় পাতের গতিশীল ব্যবস্থা নেই। এতদিন বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, এমন ব্যবস্থা ছাড়া বড় ও জটিল ম্যাগমা চক্র গড়ে ওঠা সম্ভব নয়। কিন্তু নতুন গবেষণা সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছে।

গবেষকদের মতে, মঙ্গলের এই ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য প্রমাণ করে, প্লেট টেকটোনিক্স না থাকলেও কোনো গ্রহে জটিল ভূত্বক ও দীর্ঘস্থায়ী ম্যাগমা ব্যবস্থা তৈরি হতে পারে। ফলে সৌরজগতের বাইরের অনেক পাথুরে গ্রহেও প্রাণের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ গড়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে।

মঙ্গলকে সাধারণত একটি ‘স্থবির ঢাকনা’ গ্রহ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ পৃথিবীর মতো এর উপরিভাগ বিভিন্ন টেকটোনিক প্লেটে বিভক্ত নয়। পৃথিবীতে আগ্নেয়গিরি, পর্বতমালা এবং মহাদেশ গঠনের পেছনে এসব প্লেটের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাই দীর্ঘদিন ধরে ধারণা করা হয়েছিল, মঙ্গলে এ ধরনের জটিল ভূতাত্ত্বিক বিবর্তন ঘটেনি।

তবে নতুন গবেষণা বলছে, মঙ্গল ভিন্ন একটি ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ায় নিজস্ব উচ্চমাত্রায় বিবর্তিত ভূত্বক তৈরি করেছে।

এই গবেষণায় ব্যবহার করা হয়েছে নাসার ইনসাইট ল্যান্ডারের সংগৃহীত সিসমিক বা ভূকম্পনসংক্রান্ত তথ্য। মঙ্গলে উল্কাপিণ্ডের আঘাত এবং ‘মার্সকোয়েক’ বা মঙ্গল-কম্পনের ফলে সৃষ্টি হওয়া সিসমিক তরঙ্গ বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা গ্রহটির অভ্যন্তরীণ গঠন সম্পর্কে নতুন তথ্য পেয়েছেন।

গবেষকেরা মঙ্গলের পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২৪ কিলোমিটার গভীরে অবস্থিত একটি রহস্যময় স্তর বিশ্লেষণ করেন। নাসার সংগৃহীত তথ্যের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের শিলার গঠনগত বৈশিষ্ট্যের তুলনা করে তারা দেখতে পান, ওই স্তরের নিচের অংশ মূলত লোহা ও ম্যাগনেসিয়ামসমৃদ্ধ আল্ট্রাম্যাফিক শিলা দিয়ে গঠিত। অন্যদিকে ওপরের অংশে রয়েছে তুলনামূলক বেশি সিলিকাযুক্ত ম্যাফিক শিলা।

গবেষণার প্রধান লেখক এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক টোবারমোরি ম্যাককে-চ্যাম্পিয়ন বলেন, আগে ধারণা করা হতো পৃথিবীর তুলনায় মঙ্গলের আগ্নেয়গিরির কার্যক্রম অনেক সহজ ও সীমিত ছিল। কিন্তু নতুন ফলাফল ইঙ্গিত দিচ্ছে, মঙ্গলের অভ্যন্তরে দীর্ঘ সময় ধরে সক্রিয় একটি ম্যাগমা ব্যবস্থা ছিল, যেখানে গলিত শিলা ক্রমাগত বিবর্তিত হয়ে পুরো ভূত্বককে পুনর্গঠন করেছে।

তার মতে, এই আবিষ্কার সৌরজগতের বাইরের পাথুরে গ্রহগুলোর ভূতাত্ত্বিক বিবর্তন নিয়েও নতুন প্রশ্ন ও সম্ভাবনার জন্ম দিয়েছে।

গবেষণার সহ-লেখক এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক জন ওয়েড বলেন, ‘গ্রহবিজ্ঞানের অন্যতম বড় প্রশ্ন হলো—পৃথিবী কি সত্যিই অনন্য? যদি মঙ্গল প্লেট টেকটোনিক্স ছাড়াই এত জটিল ভূত্বক তৈরি করতে পারে, তাহলে আমরা যতটা ভাবতাম, তার চেয়ে অনেক বেশি গ্রহে প্রাণের উপযোগী পরিবেশ গড়ে উঠতে পারে।’

তিনি আরও বলেন, যেসব গ্রহকে এতদিন আকার বা টেকটোনিক কার্যকলাপের অভাবের কারণে সম্ভাবনার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল, সেগুলোকেও এখন নতুনভাবে মূল্যায়ন করার প্রয়োজন হতে পারে।

 

আইএনবি/বিভূঁইয়া


প্রিন্ট
Tag :

বিশাল ম্যাগমা ব্যবস্থার সন্ধান পাওয়া গেল মঙ্গল গ্রহে

আপডেট সময় ০৪:৪২:২৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬

প্রযুক্তি ডেস্ক: মঙ্গল গ্রহের গভীরে বিশাল ও দীর্ঘস্থায়ী ম্যাগমা (গলিত লাভা) ব্যবস্থার সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা।

নাসার ‘ইনসাইট’ মিশনের তথ্য বিশ্লেষণ করে পাওয়া এই আবিষ্কার মঙ্গলের ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করছে। একই সঙ্গে সৌরজগতের বাইরের পাথুরে গ্রহগুলোতেও প্রাণের উপযোগী পরিবেশ থাকার সম্ভাবনা আগের চেয়ে আরও জোরালো হয়েছে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্ট জানিয়েছে, নতুন গবেষণায় মঙ্গলের ভূত্বকের গভীরে একটি বড় ও লুকিয়ে থাকা ম্যাগমা ব্যবস্থার প্রমাণ মিলেছে। গবেষকদের মতে, এটি ইঙ্গিত দেয় যে একসময় মঙ্গলেও পৃথিবীর মতো দীর্ঘস্থায়ী ম্যাগমা ব্যবস্থা সক্রিয় ছিল।

এ আবিষ্কারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, মঙ্গলে পৃথিবীর মতো প্লেট টেকটোনিক্স বা ভূত্বকীয় পাতের গতিশীল ব্যবস্থা নেই। এতদিন বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, এমন ব্যবস্থা ছাড়া বড় ও জটিল ম্যাগমা চক্র গড়ে ওঠা সম্ভব নয়। কিন্তু নতুন গবেষণা সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছে।

গবেষকদের মতে, মঙ্গলের এই ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য প্রমাণ করে, প্লেট টেকটোনিক্স না থাকলেও কোনো গ্রহে জটিল ভূত্বক ও দীর্ঘস্থায়ী ম্যাগমা ব্যবস্থা তৈরি হতে পারে। ফলে সৌরজগতের বাইরের অনেক পাথুরে গ্রহেও প্রাণের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ গড়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে।

মঙ্গলকে সাধারণত একটি ‘স্থবির ঢাকনা’ গ্রহ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ পৃথিবীর মতো এর উপরিভাগ বিভিন্ন টেকটোনিক প্লেটে বিভক্ত নয়। পৃথিবীতে আগ্নেয়গিরি, পর্বতমালা এবং মহাদেশ গঠনের পেছনে এসব প্লেটের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাই দীর্ঘদিন ধরে ধারণা করা হয়েছিল, মঙ্গলে এ ধরনের জটিল ভূতাত্ত্বিক বিবর্তন ঘটেনি।

তবে নতুন গবেষণা বলছে, মঙ্গল ভিন্ন একটি ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ায় নিজস্ব উচ্চমাত্রায় বিবর্তিত ভূত্বক তৈরি করেছে।

এই গবেষণায় ব্যবহার করা হয়েছে নাসার ইনসাইট ল্যান্ডারের সংগৃহীত সিসমিক বা ভূকম্পনসংক্রান্ত তথ্য। মঙ্গলে উল্কাপিণ্ডের আঘাত এবং ‘মার্সকোয়েক’ বা মঙ্গল-কম্পনের ফলে সৃষ্টি হওয়া সিসমিক তরঙ্গ বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা গ্রহটির অভ্যন্তরীণ গঠন সম্পর্কে নতুন তথ্য পেয়েছেন।

গবেষকেরা মঙ্গলের পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২৪ কিলোমিটার গভীরে অবস্থিত একটি রহস্যময় স্তর বিশ্লেষণ করেন। নাসার সংগৃহীত তথ্যের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের শিলার গঠনগত বৈশিষ্ট্যের তুলনা করে তারা দেখতে পান, ওই স্তরের নিচের অংশ মূলত লোহা ও ম্যাগনেসিয়ামসমৃদ্ধ আল্ট্রাম্যাফিক শিলা দিয়ে গঠিত। অন্যদিকে ওপরের অংশে রয়েছে তুলনামূলক বেশি সিলিকাযুক্ত ম্যাফিক শিলা।

গবেষণার প্রধান লেখক এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক টোবারমোরি ম্যাককে-চ্যাম্পিয়ন বলেন, আগে ধারণা করা হতো পৃথিবীর তুলনায় মঙ্গলের আগ্নেয়গিরির কার্যক্রম অনেক সহজ ও সীমিত ছিল। কিন্তু নতুন ফলাফল ইঙ্গিত দিচ্ছে, মঙ্গলের অভ্যন্তরে দীর্ঘ সময় ধরে সক্রিয় একটি ম্যাগমা ব্যবস্থা ছিল, যেখানে গলিত শিলা ক্রমাগত বিবর্তিত হয়ে পুরো ভূত্বককে পুনর্গঠন করেছে।

তার মতে, এই আবিষ্কার সৌরজগতের বাইরের পাথুরে গ্রহগুলোর ভূতাত্ত্বিক বিবর্তন নিয়েও নতুন প্রশ্ন ও সম্ভাবনার জন্ম দিয়েছে।

গবেষণার সহ-লেখক এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক জন ওয়েড বলেন, ‘গ্রহবিজ্ঞানের অন্যতম বড় প্রশ্ন হলো—পৃথিবী কি সত্যিই অনন্য? যদি মঙ্গল প্লেট টেকটোনিক্স ছাড়াই এত জটিল ভূত্বক তৈরি করতে পারে, তাহলে আমরা যতটা ভাবতাম, তার চেয়ে অনেক বেশি গ্রহে প্রাণের উপযোগী পরিবেশ গড়ে উঠতে পারে।’

তিনি আরও বলেন, যেসব গ্রহকে এতদিন আকার বা টেকটোনিক কার্যকলাপের অভাবের কারণে সম্ভাবনার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল, সেগুলোকেও এখন নতুনভাবে মূল্যায়ন করার প্রয়োজন হতে পারে।

 

আইএনবি/বিভূঁইয়া


প্রিন্ট