ইরানকে হটিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে রাজত্ব করার লক্ষ্যে এগোচ্ছে চার দেশ? :

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: পাকিস্তানে গত মাসে অনুষ্ঠিত চার দেশের বৈঠকের পর থেকে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক নতুন মোড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

বিশেষ করে পাকিস্তান, তুরস্ক, মিশর এবং সৌদি আরব মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা নিরসনে শক্তিশালী আঞ্চলিক ব্লক হিসেবে আত্মপ্রকাশের চেষ্টা করছে। এই চার দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ইসলামাবাদে বৈঠক করার দুই সপ্তাহের মধ্যেই ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, যাকে বৈশ্বিক কূটনীতির বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ গত ৮ এপ্রিল এই যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন এবং এখন উভয় পক্ষ পরবর্তী আলোচনার জন্য আবারও ইসলামাবাদে সমবেত হতে যাচ্ছে।

ইসলামাবাদের এই কূটনৈতিক তৎপরতা মূলত ইরান ও ইসরায়েলকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া আঞ্চলিক মেরুকরণের বাইরে একটি বিকল্প ব্যবস্থার জন্ম দিয়েছে। এক সময়কার প্রভাবশালী দেশ ইরান ও ইসরায়েল বর্তমানে এই অঞ্চলে অনেকটা একাকী হয়ে পড়েছে। বিপরীতে তুরস্ক বা সৌদি আরবের মতো দেশগুলো নেতৃত্বে নতুন সুযোগ পাচ্ছে। ২০২০ সালে স্বাক্ষরিত আব্রাহাম অ্যাকর্ডের মাধ্যমে যে স্থিতিশীলতার স্বপ্ন দেখা হয়েছিল, তা বর্তমানে অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে। বিশেষ করে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের দাবিতে সৌদি আরবের অনড় অবস্থান এবং ইসরায়েলি পার্লামেন্টের পক্ষ থেকে তার বিরোধিতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

তুরস্কের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্কের অবনতিও এই নতুন জোট গঠনের পেছনে বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে। গাজা সংঘাতকে কেন্দ্র করে ২০২৪ সাল থেকে তুরস্ক সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। কাতারও বর্তমানে পশ্চিমা বিশ্বের কাছে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজের অবস্থান হারিয়েছে। অন্যদিকে ইরান তার মিত্রদের হারিয়ে ক্রমশ কোণঠাসা হয়ে পড়ছে, বিশেষ করে তাদের সৌদি আরব ও কাতারের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা চালানোর অভিযোগ ওঠার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে তেহরানের গ্রহণযোগ্যতা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা থাকলেও চীন ও হুথির কাছ থেকে ইরান আগের মতো জোরালো সমর্থন পাচ্ছে না।

এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সুযোগে পাকিস্তান, সৌদি আরব, তুরস্ক এবং মিশর নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক জোরদার করে নতুন আঞ্চলিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। এই চারটি রাষ্ট্রই বর্তমান ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতিষ্ঠিত ‘বোর্ড অফ পিস’-এর সদস্য। যদিও ঐতিহাসিকভাবে এই দেশগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য ছিল কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় তারা একে অপরের ওপর নির্ভর করতে শুরু করেছে। বিশেষ করে অর্থনৈতিক এবং সামরিক নিরাপত্তার স্বার্থে তারা এখন অভিন্ন প্ল্যাটফর্মে এসে দাঁড়িয়েছে।

ভৌগোলিক ও কৌশলগত দিক থেকে এই চার দেশের ঐক্যবদ্ধ হওয়া অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়। পাকিস্তানের রয়েছে পারমাণবিক শক্তি এবং বিশাল সেনাবাহিনী, অন্যদিকে সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি তেলের মজুদদার। একইভাবে মিশর সুয়েজ খালের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে এবং তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য হওয়ার পাশাপাশি অত্যন্ত উন্নত সামরিক শিল্পের অধিকারী। এই চার দেশের সম্মিলিত জনসংখ্যা প্রায় ৫০ কোটি। ফলে তারা মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তিও বটে।

অতীতের তাকালে দেখা যায় যে, সৌদি আরব ও মিশরের মধ্যে আদর্শগত লড়াই এক সময় অত্যন্ত প্রকট ছিল। প্যান-আরব জাতীয়তাবাদ বনাম রাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার সেই দ্বন্দ্ব বর্তমানে প্রেসিডেন্ট সিসি এবং যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের মধ্যকার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের মাধ্যমে বিলুপ্ত হয়েছে। একইভাবে সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে তুরস্ক ও সৌদি আরবের মধ্যে যে চরম উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল, তাও ২০২২ সালের পর থেকে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে প্রশমিত করা হয়েছে। এখন এই দেশগুলো নিজেদের দ্বিপাক্ষিক তিক্ততা ভুলে বৃহত্তর আঞ্চলিক স্বার্থে এক হয়েছে।

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান বর্তমানে এশিয়া ও ইউরোপকে সংযুক্ত করার জন্য বেশ কিছু ভূ-অর্থনৈতিক প্রকল্প হাতে নিয়েছেন। বিশেষ করে ‘মিডল ইস্ট করিডোর’ প্রকল্পের মাধ্যমে পারস্য উপসাগর থেকে ইউরোপ পর্যন্ত অর্থনৈতিক সংযোগ স্থাপনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। যদিও পাকিস্তান ও সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা চুক্তির বাস্তবায়ন নিয়ে কিছু প্রশ্ন রয়েছে, তবুও বর্তমান যুদ্ধাবস্থায় পাকিস্তান যেভাবে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে, তা তাদের পারস্পরিক বিশ্বাসের জায়গা আরও মজবুত করেছে।
সূত্র: এশিয়ান টাইমস

আইএনবি/বিভূঁইয়া