প্রতিশ্রুতি নয়, স্বচ্ছ নীতি ও বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ চান ব্যবসায়ীরা

নির্বাচনি ইশতেহার

আইএনবি ডেস্ক:দেশবাসীর বহুল প্রত্যাশিত অবশেষে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। দেশের জনগণ আগামী পাঁচ বছরের জন্য নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনে ভোট দিতে যাচ্ছেন, যেখানে ব্যবসায়ী ও সাধারণ ভোটাররা আশা করছেন নতুন নেতৃত্ব একটি উন্নত ও ন্যায়ভিত্তিক শাসনব্যবস্থা উপহার দেবে।

২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে পতন হয় আওয়ামী লীগের। এরপর থেকে দেশ চালাচ্ছে শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। এই সরকারের নেতৃত্বে দেশ নানা সংস্কার ও পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে। কিন্তু গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির ফলে ব্যবসায়ী সমাজ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বাণিজ্য ও বিনিয়োগ কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য পতন লক্ষ্য করা গেছে।

এই অবস্থায় রাজনৈতিক দলগুলো যখন নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করছে, ব্যবসায়ীরা তাদের প্রত্যাশা ও দাবিগুলো প্রতিফলিত করার আহ্বান জানাচ্ছেন, যাতে ব্যবসায়িক আস্থা পুনরুদ্ধার করা যায়। ব্যবসায়ীরা চাইছেন নির্বাচনি ইশতেহারে কেবল সাধারণ প্রতিশ্রুতি নয়, বরং একটি বাস্তবসম্মত ও সুস্পষ্ট রোডম্যাপ থাকা।

দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার এবং বিনিয়োগ কার্যক্রমকে গতিশীল করতে ব্যবসায়ী মহল নিম্নোক্ত বিষয়গুলোর প্রতিফলন দেখতে চায় রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনি ইশতেহারে।

নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলার উন্নতি
নতুন উদ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু করতে তারা চান সম্মান, জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা। চাঁদাবাজি, বিশৃঙ্খলা ও ‘মব কালচার’ বন্ধ চান তারা; নইলে ব্যবসা ও বিনিয়োগ টেকসই হবে না।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও সরবরাহ ব্যবস্থা
শুধু সুদের হার বাড়িয়ে নয়, খাদ্য ও নিত্যপণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নতি, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করা এবং কৃষক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত সরাসরি বিপণনের কার্যকর ব্যবস্থা থাকা জরুরি, যাতে কৃষক ন্যায্য দাম পান এবং ভোক্তা ক্ষতিগ্রস্ত না হন।

আর্থিক ও জ্বালানি সুবিধা
ব্যাংক ঋণের সুদের হার কমানো, গ্যাস ও জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ এবং সরকারি কর্মকর্তাদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য নীতিগত সংস্কার আনা অপরিহার্য। দুর্বল নীতি ও কর্মে এবং সেবা পেতে দীর্ঘ সময় ব্যবসার ক্ষেত্রে বড় বাধা।

রাজস্ব নীতি
ব্যবসায়ীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ না দিয়ে অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজস্ব বৃদ্ধির কৌশল নির্দিষ্টভাবে ইশতেহারে তুলে ধরতে হবে।

শিল্প খাতের সুরক্ষা ও উন্নয়ন
গার্মেন্টসের পরে চামড়া খাত দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এবং সম্ভাবনাময় শিল্প হলেও কাঠামোগত সমস্যার কারণে পিছিয়ে আছে। বিশেষ করে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি)কমপ্লায়েন্স ও কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে অনেক ট্যানারি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও সনদ থেকে বঞ্চিত হয়েছে, যা খাতের প্রবৃদ্ধি ও প্রতিযোগিতা সীমিত করছে। নতুন সরকারের কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে শিল্প খাতকে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব।

যা বলছেন ব্যবসায়ী নেতারা
রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনি ইশতেহার প্রসঙ্গে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রির (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ারুল আলম চৌধুরী পারভেজ জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা চাই যে নির্বাচনি ইশতেহারে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হোক ব্যবসা-বান্ধব নীতি। ব্যবসায়ীদের সম্মান ও জান-মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আইনশৃঙ্খলার উন্নতি করা, মব কালচার ও বিশৃঙ্খলা বন্ধের প্রতিশ্রুতি থাকা জরুরি। কারণ এসব ছাড়া কোনো ব্যবসা বা বিনিয়োগ টেকসই হবে না।’

‘আমরা চাই সরকার কেবল সুদের হার বাড়ানোর মাধ্যমে নয়, বরং খাদ্য ও নিত্যপণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নত করে, মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রতিহত করে এবং কৃষক থেকে ভোক্তার কাছে সরাসরি বিপণনের কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে। এতে কৃষক ন্যায্য দাম পাবে এবং ভোক্তাও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না।’

পারভেজ আরও বলেন, ব্যাংক ঋণের সুদের হার কমানো, গ্যাস ও জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, প্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং রাজস্ব আদায়ে ব্যবসায়ীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ না দিয়ে অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজস্ব বৃদ্ধির স্পষ্ট রোডম্যাপ ইশতেহারে থাকা প্রয়োজন। সরকারের উচিত এইসব পদক্ষেপের জন্য নির্দিষ্ট রোডম্যাপ প্রদর্শন করা, যাতে ব্যবসায়ী সমাজ জানতে পারে যে তারা কীভাবে বাস্তবায়ন করবে।’

‘শুধু প্রতিশ্রুতি দিয়ে কাজ হবে না; স্পষ্ট ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপের রোডম্যাপ থাকলেই ব্যবসায়ীরা দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়াতে পারবে।’ বলে যোগ করেন বিসিআই সভাপতি।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেছেন, ‘বাংলাদেশ বর্তমানে একটি সংকটময় সন্ধিক্ষণে অবস্থান করছে। এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী ধাক্কা, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তাসহ নানা চ্যালেঞ্জ সামনে রয়েছে। অন্যদিকে, সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের অর্থনীতি অস্থিরতা ও সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে, উত্তাল এই সময় অতিক্রম করার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে যথাযথ দিকনির্দেশনা অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।’

‘এটি যেন কোনো আবেগঘন বা কথার ফুলঝুরি না হয়; বরং বাস্তবভিত্তিক ও কার্যকর হতে হবে এবং এতে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হওয়া উচিত যে দেশ ও দেশের নাগরিকদের স্বার্থে তারা সত্যিই তা বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’ বলছিলেন মোহাম্মদ হাতেম।

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ও সালমা ট্যানারির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, ‘দেশের ব্যবসায়ী সমাজ এমন নির্বাচনি ইশতেহারে চায় যেখানে থাকবে স্বচ্ছ নীতি, বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা এবং নির্দিষ্ট রোডম্যাপ, যা শিল্প-বাণিজ্যকে সমৃদ্ধ করবে, বিনিয়োগ আকর্ষণ করবে এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করবে।’

নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণে ১৩ দফা নাগরিক ইশতেহার
সুরক্ষা ও অধিকার নিশ্চিতে ৬ দফা ইশতেহার দিলো শিশুরা
সড়ক দুর্ঘটনা রোধের পরিকল্পনা নির্বাচনী ইশতেহারে যুক্তের দাবি

সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, ‘আমরা আশা করি ব্যবসায়ীদের চ্যালেঞ্জগুলো বিবেচনা করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি থাকবে। সরকার ও শিল্পের মধ্যে মিলেমিশে কাজ করলে চামড়া খাত পুনরায় এগিয়ে যাবে, বিনিয়োগ আকৃষ্ট হবে এবং গুরুত্বপূর্ণ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।’

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সাবেক পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার রাজীব হায়দার বলেন, ‘নির্বাচনি ইশতেহারে ব্যবসায়ীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এমন নীতি ও পদক্ষেপ দেখানো যা দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেবে এবং দেশের ব্যবসায়িক পরিবেশকে উন্নত করবে। আমাদের নীতি নির্ধারণে দেশীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। বিশ্বব্যাপী যে দেশগুলো সফল শিল্পনীতি প্রয়োগ করেছে, তারা নিজস্ব শিল্প ও কর্মসংস্থান রক্ষায় কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। আমাদের নীতিগুলো এমন হওয়া উচিত যা শিল্পকে বাঁচাবে, বিনিয়োগ আকৃষ্ট করবে এবং কর্মসংস্থান নিশ্চিত করবে। সরকার ও শিল্প খাতের সহযোগিতা ব্যবসা ও শিল্পকে এগিয়ে নেওয়ার সবচেয়ে কার্যকর পথ।’

আইএনবি/বিভূঁইয়া