আইএনবি ডেস্ক: ঢাকার আদালত থেকে একটি মামলার মূল নথি চুরির তদন্ত করতে গিয়ে অস্ত্র, মাদক ও হত্যা মামলার ভুয়া রায়ের কপি তৈরির একটি চক্রের হদিস পেয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তারের পর পুরান ঢাকার আদালতপাড়া এলাকার একটি কম্পিউটারের দোকান থেকে ১৩টি মামলার ভুয়া রায়ের কপি জব্দ করা হয়েছে। ভুয়া রায় লেখার পর সেখানে বিচারকের জাল সিল ও সই দিয়ে আসছিল জালিয়াত চক্রটি। ঢাকা মহানগর পুলিশের কোতোয়ালি থানা-পুলিশ মোট ১৫টি মামলার ভুয়া রায়ের কপি জব্দ করেছে। এতে ভুয়া রায়ে মামলাগুলোর সব আসামিকে খালাস দেওয়া হয়েছে। ভুয়া এই রায়ের কপি দেখিয়ে মামলার আসামিপক্ষ আদালতসহ বিভিন্ন স্থান থেকে অবৈধ আইনি সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেছিল বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।
ঘটনার সূত্রপাত গত ২ জুলাই। সেদিন ঢাকার অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতের এজলাস কক্ষে অজ্ঞাত এক ব্যক্তি এসে আইনজীবীর সহকারী পরিচয়ে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল মামলা নম্বর-৪৭(৩) ২১, ধারা-১৯(এ) অস্ত্র আইন ১৮৭৮-এর নথি চান। আদালতের উমেদার নাজমুল হাসান এক হাজার টাকার বিনিময়ে নথিটি তাকে দেন। কিছুক্ষণ পর উক্ত আদালতের বিচারকের ডাকে উমেদার নাজমুল হাসান খাস কামরায় যান। এর কিছুক্ষণ পর আইনজীবীর সহকারী পরিচয়দানকারী ওই ব্যক্তি উক্ত মামলার মূল নথিটি চুরি করে মুখে মাস্ক পরে পালিয়ে যান। এ ঘটনায় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ দ্বিতীয় আদালতের বিচারকের নির্দেশে আদালতের বেঞ্চ সহকারী মো. খায়রুল আলম বাদী হয়ে ওই দিনই কোতোয়ালি থানায় একটি মামলা করেন।
ওই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কোতোয়ালি থানার এসআই দেবাশীষ হাওলাদার ঘটনার পর মহানগর দায়রা জজ আদালতের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ ও পর্যালোচনা করেন।
এতে নথি চুরির সঙ্গে সরাসরি জড়িত ব্যক্তি হিসেবে মো. আনোয়ারুল হক ওরফে রাসেল ওরফে মুরগি রাসেলকে শনাক্ত করা হয়। পরে গত ২১ আগস্ট শ্যামপুর থানাধীন একতা হাউজিং এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করেন। গ্রেপ্তারের পর তার দেওয়া তথ্যে গ্রেপ্তার করা হয় বিশেষ ট্রাইব্যুনাল মামলা নম্বর-৪০৯/২১ ও খিলগাঁও থানার মামলা নম্বর-৪৭(৩) ২১, ধারা-১৯(এ) অস্ত্র আইন ১৮৭৮-এর এজাহারনামীয় আসামি তানভীর আহমেদ তনয়ের স্ত্রী জামিলা আক্তার ওরফে অর্পাকে (৩৮)। পরে অর্পার দেওয়া তথ্যে তার মান্ডার বাসার আলমারি থেকে চুরি হওয়া বিশেষ ট্রাইব্যুনাল মামলা নম্বর-৪০৯/২১ ও খিলগাঁও থানার মামলা নম্বর-৪৭(৩) ২১, ধারা-১৯(এ) অস্ত্র আইন ১৮৭৮-এর মূল নথি এবং ভাটারা থানার আমলা নম্বর-৪৭ (৭) ২০২০, জিআর নম্বর-৪৭/২০২০, টিআর নম্বর-৩৬৫/২০২০, ধারা-৩৬(১) সারণির ১০(ক) মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৮ এর মূল নথি উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া ওই আলমারি থেকে মহানগর দায়রা জজের স্বাক্ষর জাল করে বিজ্ঞ আদালতের ভুয়া সিল ব্যবহার করে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল মামলা নম্বর-৪০৯/২১-এর প্রস্তুতকৃত ভুয়া রায়ের কপিও জব্দ করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা।
এদিকে, গ্রেপ্তার হওয়া মুরগি রাসেল এবং অর্পাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে হাজির করে ৫ দিনের পুলিশ রিমান্ডে নেন তদন্ত কর্মকর্তা। রিমান্ডে আসামি মো. আনোয়ারুল হক ওরফে রাসেল ওরফে মুরগি রাসেল পুলিশকে জানায়, বিজ্ঞ অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালতের উমেদার নাজমুল হাসান ওরফে রনি এবং বিজ্ঞ সিএমএম কোর্ট নম্বর-০৮ এর জনৈক উমেদার সাদ্দাম হোসেন এক হাজার টাকার বিনিময়ে উক্ত জুডিশিয়াল নথি তাকে গোপনে সরবরাহ করেন। এরপর বিশেষ ট্রাইব্যুনাল মামলা নম্বর-৪০৯/২১ ও খিলগাঁও থানার মামলা নম্বর-৪৭(৩)২১, ধারা-১৯(এ) অস্ত্র আইন-১৮৭৮ এর মূল নথি দেখে ঢাকার কোতোয়ালি থানাধীন ১৮ নম্বর জনসন রোড কোর্ট হাউস স্ট্রিটের ‘আহনাফ অনুবাদ সেন্টার’ কম্পিউটারের দোকানে উক্ত দোকানের মালিক আহসান হাবিব ভুয়া রায়ের কপি জাল জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি করে। সেখানে বিজ্ঞ বিচারকের সই ও সিল দেন। আহসান হাবিব জিজ্ঞাসাবাদে কম্পিউটার দ্বারা বিশেষ ট্রাইব্যুনাল মামলা নম্বর-৪০৯/২১ ও খিলগাঁও থানার মামলা নম্বর-৪৭(৩)২১, ধারা-১৯(এ) অস্ত্র আইন ১৮৭৮-এর ভুয়া রায়ের কপি জাল জালিয়াতির মাধ্যমে প্রস্তুত করার কথা স্বীকার করেন।
পরে লালবাগ বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমানের নির্দেশে পুলিশ গত ২৩ আগস্ট আহসান হাবিবের ‘আহনাফ অনুবাদ সেন্টার’-এ অভিযান চালায়। সেখানে থাকা একটি কম্পিউটার তল্লাশি করে লোকাল ডিস্কের একটি ফোল্ডারে সংরক্ষিত মামলা নম্বর-৪০৯/২১-এর প্রস্তুতকৃত ভুয়া রায়ের কপিসহ ডিএমপির থানার ১৩টি মামলার প্রস্তুতকৃত ভুয়া রায়ের কপি জব্দ করে। এ সময় পুলিশ ওই কম্পিউটারটি জব্দ করে। পরবর্তী সময়ে গ্রেপ্তার তিন আসামিকে রিমান্ডে নিয়ে মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদের সময় বেরিয়ে আসে বিভিন্ন মামলার ভুয়া রায়ের কপি তৈরির চাঞ্চল্যকর তথ্য।
আসামি মুরগি রাসেল পুলিশকে বলেন, ভুয়া রায়ের কপি তৈরির জন্য তিনি আহসান হাবিবকে ইতোমধ্যে প্রায় ৭০ হাজার টাকা দিয়েছেন। অন্যদিকে, আসামি অর্পা পুলিশকে বলেছেন, তিনি তার স্বামী অস্ত্র আইন মামলার আসামি তানভীর আহমেদ তনয়কে রক্ষার জন্য জাল জালিয়াতির মাধ্যমে মামলার ভুয়া রায় তৈরির জন্য টাকা দিয়েছিলেন। বর্তমানে তার স্বামী তনয় সৌদি আরবে অবস্থান করছেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কোতোয়ালি থানার এসআই দেবাশীষ হাওলাদার গতকাল বৃহস্পতিবার আমাদের সময়কে বলেন, চক্রটি জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে যেসব মামলার ভুয়া রায়ের কপি তৈরি করেছে তার মধ্যে অস্ত্র, মাদক এবং হত্যা মামলাও রয়েছে। তিনি বলেন, আদালতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তৈরি করা প্রতিটি মামলার ভুয়া রায়ে আসামিদের খালাস দেওয়া হয়েছে। এসব মামলার আসামিরা এখন পলাতক। তিন আসামির মধ্যে মুরগি রাসেল ও আহসান হাবিব পুলিশ রিমান্ডে রয়েছেন। আর আসামি অর্পা আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি প্রদান করায় তাকে জেল-হাজতে প্রেরণ করেন বিজ্ঞ আদালত।
সূত্র:আমাদের সময়
আইএনবি/বিভূঁইয়া
প্রিন্ট

পুরান ঢাকার আদালত পাড়ায় কম্পিউটারের দোকানে লেখা হতো মামলার ভুয়া রায় 
























