ঢাকা , শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬, ১১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
লক্ষ্মীপুরে বাসায় ঢুকে কুপিয়ে হত্যা

বিদ্যুৎস্পৃষ্টে বাবা, ঘাতকের হাতে মা ও তিন মেয়ের মৃত্যুতে শেষ একটি পরিবার

সংগৃহীত ছবি

লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি:  লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে মা ও দুই মেয়েকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় আহত মেজো মেয়ে নাফিজা আক্তার ইকরাও (১৬) মারা গেছে। এ নিয়ে মা ও তিন মেয়ের মৃত্যু হলো। পরিবারে শুধু বেঁচে আছে ইকরার একমাত্র ভাই।

এর আগে বেলা ১১টার দিকে রায়পুর পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের গোডাউন রোড এলাকার ভাড়া বাসায় এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। ঘটনার পরপরই হত্যায় অভিযুক্ত জহিরকে আটক করেন স্থানীয় লোকজন। পরে তাকে গণপিটুনি দেওয়া হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে। এরপর তারও মৃত্যু হয়।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নেওয়ার পথে বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) বিকাল ৩টার দিকে আহত অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। একই ঘটনায় তার মা ও দুই বোন নিহত হন।

নিহতরা হলেন- মা শাহিনুর বেগম (৩৮), তার বড় মেয়ে সায়মা আক্তার (২০) ও ছোট মেয়ে শিফা আক্তার (৯)। ওই সময় মেজো মেয়ে নাফিজা আক্তার ইকরা আহত হন।

 

পুলিশ জানায়, শাহিনুর বেগমের বাড়ি কুমিল্লা জেলায়। তারা বেশ কয়েক বছর ধরে রায়পুরের ওই বাসায় ভাড়া আছেন। তার বড় মেয়ে সায়মা আক্তার আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেছেন। মেজো মেয়ে নাফিজা আক্তার ইকরা রায়পুর সরকারি মার্চেন্টস একাডেমি থেকে এসএসসির ফলপ্রত্যাশী ছিল। একই প্রতিষ্ঠানের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী ছিল ছোট মেয়ে শিফা আক্তার। আর একমাত্র ছেলে জুনায়েদ ইসলাম রায়পুর সরকারি কলেজে দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ার পাশাপাশি একটি দোকানে কাজ করছেন।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শাহিনুরের স্বামী মো. কামাল হোসেন ২০১৯ সালে উপজেলার মোল্লারহাট এলাকায় রাস্তায় পড়ে থাকা তারে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান। তিনি গ্রামে ঘুরে ঘুরে হাঁড়ি-পাতিল বিক্রি করতেন। স্বামীর মৃত্যুর পর থেকে তিন মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে ভাড়া বাসায় থাকতেন শাহিনুর। অভিযুক্ত ওই যুবক নোয়াখালীর বাসিন্দা হলেও রায়পুরে ভ্যানে করে ফল বিক্রি করতেন। এক বছর আগে শাহিনুরের ওই ভবনের একটি কক্ষে ভাড়া থাকতেন। সেখান থেকে তাদের মধ্যে পরিচয় হয়। তবে কেন হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন, তা এখনও নিশ্চিতভাবে জানাতে পারেনি পুলিশ।

রায়পুরে মা ও দুই মেয়েকে কুপিয়ে হত্যারায়পুরে মা ও দুই মেয়েকে কুপিয়ে হত্যা
প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সকালে বাসায় ঢুকে মা ও তিন মেয়েকে কুপিয়ে জখম করেন জহির। এতে ঘটনাস্থলেই শাহিনুর ও মেয়ে শিফা আক্তারের মৃত্যু হয়। গুরুতর আহত সায়মা আক্তারকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার পর মৃত্যু হয়। আর নাফিজা আক্তারকে ঢাকা নেওয়ার পথে মৃত্যু হয়। ঘটনার সময় ছেলে জুনায়েদ বাসায় ছিলেন না। তিনি যে দোকানে কাজ করেন সেখানে ছিলেন।

ঘরের ভেতর থেকে চিৎকার শুনে প্রতিবেশীরা এগিয়ে আসেন। তারা ঘরে ঢুকে শাহিনুর ও তার মেয়েদের রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। পরে তাদের উদ্ধার করে রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। ঘটনার পর অভিযুক্ত যুবক পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে আটক করে গণপিটুনি দেন স্থানীয় লোকজন।

স্থানীয়দের গণপিটুনিতে অভিযুক্ত যুবকও মারা গেছে
স্থানীয়দের গণপিটুনিতে অভিযুক্ত যুবকও মারা গেছে

রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) মামুনুর রশিদ বলেন, ‘শাহিনুর ও শিফাকে হাসপাতালে আনার আগেই মৃত্যু হয়েছে। সায়মাকে হাসপাতালে আনার পর মৃত্যু হয়। আহত অভিযুক্ত ওই যুবকেরও হাসপাতালে মৃত্যু হয়েছে। ইকরাকে ঢাকা নেওয়ার পথে কুমিল্লায় মৃত্যু হয়েছে।’

রায়পুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহীন মিয়া বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাস্থল থেকে প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহ করা হচ্ছে। নিহতদের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদঘাটনে তদন্ত চলছে।’

মা ও দুই মেয়েকে কুপিয়ে হত্যায় অভিযুক্ত পিটুনিতে মারা গেছেনমা ও দুই মেয়েকে কুপিয়ে হত্যায় অভিযুক্ত পিটুনিতে মারা গেছেন
কেন হত্যাকাণ্ড ঘটেছে জানতে চাইলে লক্ষ্মীপুরের সহকারী পুলিশ সুপার (রায়পুর সার্কেল) মো. আব্দুর রাশেদ বলেন, ‘তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। মা ও তিন মেয়ের মৃত্যু হয়েছে। সেইসঙ্গে অভিযুক্ত যুবকও মারা গেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গেলে উত্তেজিত লোকজনের ছোড়া ইটপাটকেলের আঘাতে পুলিশের সাত সদস্য আহত হন। ঘটনার রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা চলছে। পরে বিস্তারিত জানানো হবে।’

আইএনবি/বিভূঁইয়া


প্রিন্ট
Tag :

এনসিপিসহ ৭ দলকে ইসির শোকজ

লক্ষ্মীপুরে বাসায় ঢুকে কুপিয়ে হত্যা

বিদ্যুৎস্পৃষ্টে বাবা, ঘাতকের হাতে মা ও তিন মেয়ের মৃত্যুতে শেষ একটি পরিবার

আপডেট সময় ০৯:২৪:৪২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬

লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি:  লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে মা ও দুই মেয়েকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় আহত মেজো মেয়ে নাফিজা আক্তার ইকরাও (১৬) মারা গেছে। এ নিয়ে মা ও তিন মেয়ের মৃত্যু হলো। পরিবারে শুধু বেঁচে আছে ইকরার একমাত্র ভাই।

এর আগে বেলা ১১টার দিকে রায়পুর পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের গোডাউন রোড এলাকার ভাড়া বাসায় এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। ঘটনার পরপরই হত্যায় অভিযুক্ত জহিরকে আটক করেন স্থানীয় লোকজন। পরে তাকে গণপিটুনি দেওয়া হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে। এরপর তারও মৃত্যু হয়।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নেওয়ার পথে বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) বিকাল ৩টার দিকে আহত অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। একই ঘটনায় তার মা ও দুই বোন নিহত হন।

নিহতরা হলেন- মা শাহিনুর বেগম (৩৮), তার বড় মেয়ে সায়মা আক্তার (২০) ও ছোট মেয়ে শিফা আক্তার (৯)। ওই সময় মেজো মেয়ে নাফিজা আক্তার ইকরা আহত হন।

 

পুলিশ জানায়, শাহিনুর বেগমের বাড়ি কুমিল্লা জেলায়। তারা বেশ কয়েক বছর ধরে রায়পুরের ওই বাসায় ভাড়া আছেন। তার বড় মেয়ে সায়মা আক্তার আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেছেন। মেজো মেয়ে নাফিজা আক্তার ইকরা রায়পুর সরকারি মার্চেন্টস একাডেমি থেকে এসএসসির ফলপ্রত্যাশী ছিল। একই প্রতিষ্ঠানের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী ছিল ছোট মেয়ে শিফা আক্তার। আর একমাত্র ছেলে জুনায়েদ ইসলাম রায়পুর সরকারি কলেজে দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ার পাশাপাশি একটি দোকানে কাজ করছেন।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শাহিনুরের স্বামী মো. কামাল হোসেন ২০১৯ সালে উপজেলার মোল্লারহাট এলাকায় রাস্তায় পড়ে থাকা তারে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান। তিনি গ্রামে ঘুরে ঘুরে হাঁড়ি-পাতিল বিক্রি করতেন। স্বামীর মৃত্যুর পর থেকে তিন মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে ভাড়া বাসায় থাকতেন শাহিনুর। অভিযুক্ত ওই যুবক নোয়াখালীর বাসিন্দা হলেও রায়পুরে ভ্যানে করে ফল বিক্রি করতেন। এক বছর আগে শাহিনুরের ওই ভবনের একটি কক্ষে ভাড়া থাকতেন। সেখান থেকে তাদের মধ্যে পরিচয় হয়। তবে কেন হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন, তা এখনও নিশ্চিতভাবে জানাতে পারেনি পুলিশ।

রায়পুরে মা ও দুই মেয়েকে কুপিয়ে হত্যারায়পুরে মা ও দুই মেয়েকে কুপিয়ে হত্যা
প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সকালে বাসায় ঢুকে মা ও তিন মেয়েকে কুপিয়ে জখম করেন জহির। এতে ঘটনাস্থলেই শাহিনুর ও মেয়ে শিফা আক্তারের মৃত্যু হয়। গুরুতর আহত সায়মা আক্তারকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার পর মৃত্যু হয়। আর নাফিজা আক্তারকে ঢাকা নেওয়ার পথে মৃত্যু হয়। ঘটনার সময় ছেলে জুনায়েদ বাসায় ছিলেন না। তিনি যে দোকানে কাজ করেন সেখানে ছিলেন।

ঘরের ভেতর থেকে চিৎকার শুনে প্রতিবেশীরা এগিয়ে আসেন। তারা ঘরে ঢুকে শাহিনুর ও তার মেয়েদের রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। পরে তাদের উদ্ধার করে রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। ঘটনার পর অভিযুক্ত যুবক পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে আটক করে গণপিটুনি দেন স্থানীয় লোকজন।

স্থানীয়দের গণপিটুনিতে অভিযুক্ত যুবকও মারা গেছে
স্থানীয়দের গণপিটুনিতে অভিযুক্ত যুবকও মারা গেছে

রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) মামুনুর রশিদ বলেন, ‘শাহিনুর ও শিফাকে হাসপাতালে আনার আগেই মৃত্যু হয়েছে। সায়মাকে হাসপাতালে আনার পর মৃত্যু হয়। আহত অভিযুক্ত ওই যুবকেরও হাসপাতালে মৃত্যু হয়েছে। ইকরাকে ঢাকা নেওয়ার পথে কুমিল্লায় মৃত্যু হয়েছে।’

রায়পুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহীন মিয়া বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাস্থল থেকে প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহ করা হচ্ছে। নিহতদের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদঘাটনে তদন্ত চলছে।’

মা ও দুই মেয়েকে কুপিয়ে হত্যায় অভিযুক্ত পিটুনিতে মারা গেছেনমা ও দুই মেয়েকে কুপিয়ে হত্যায় অভিযুক্ত পিটুনিতে মারা গেছেন
কেন হত্যাকাণ্ড ঘটেছে জানতে চাইলে লক্ষ্মীপুরের সহকারী পুলিশ সুপার (রায়পুর সার্কেল) মো. আব্দুর রাশেদ বলেন, ‘তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। মা ও তিন মেয়ের মৃত্যু হয়েছে। সেইসঙ্গে অভিযুক্ত যুবকও মারা গেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গেলে উত্তেজিত লোকজনের ছোড়া ইটপাটকেলের আঘাতে পুলিশের সাত সদস্য আহত হন। ঘটনার রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা চলছে। পরে বিস্তারিত জানানো হবে।’

আইএনবি/বিভূঁইয়া


প্রিন্ট