আইএনবি ডেস্ক: নেপাল-চীন সীমান্তে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধস আবারও মনে করিয়ে দিল, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এখন আর দূর ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়; এর প্রভাব ক্রমেই বাস্তব ও দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। প্রবল পানির তোড়ে নেপালের রসুয়া জেলার ঘরবাড়ি, সড়ক ও সেতু ভেসে গেছে। তিব্বতের জিরং কাউন্টিতে ভূমিধসে তৈরি হয়েছে প্রাণহানির আশঙ্কা। নিখোঁজদের মধ্যে কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রায় অংশ নেওয়া বিভিন্ন দেশের তীর্থযাত্রীও রয়েছেন। এমন দুর্গম ও পাহাড়ি এলাকায় একই সঙ্গে বন্যা, ভূমিধস ও যোগাযোগবিচ্ছিন্নতার ঘটনা মানুষের জীবনকে ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
আকস্মিক বন্যার তাৎক্ষণিক কারণ এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত না হলেও হিমবাহ গলন, হিমবাহের হ্রদের পানি বৃদ্ধি এবং অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের মতো জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি পাহাড়ি অঞ্চলে ক্রমেই বাড়ছে। একই নদীতে আগেও ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল এবং পরে হিমবাহের হ্রদ থেকে বন্যার সূত্রপাতের তথ্য পাওয়া যায়। ফলে এবারের ঘটনাকেও বৃহত্তর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপট থেকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে হিমালয় অঞ্চলের হিমবাহ ও তুষারভাণ্ডারে পরিবর্তন ঘটছে। এতে কোথাও পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বদলে যাচ্ছে, কোথাও হিমবাহের হ্রদ ফুলে উঠছে, আবার অতিবৃষ্টির সঙ্গে পাহাড়ি ঢল ও ভূমিধসের ঝুঁকিও বাড়ছে। এসব পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হচ্ছে পাহাড়ি জনপদ। কাজেই এ ধরনের দুর্যোগকে শুধু বিচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করলে চলবে না; জলবায়ু ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবেই এর মোকাবিলা করতে হবে।
বর্তমানে সবচেয়ে জরুরি কাজ নিখোঁজ ব্যক্তিদের উদ্ধার এবং দুর্গত মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া। নদীর পানি ও আবহাওয়া পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে দ্রুত উদ্ধারকারী দল পাঠাতে হবে। হেলিকপ্টার অবতরণ সম্ভব না হলে বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা সক্রিয় করতে হবে। নেপাল ও চীনের মধ্যে সীমান্তবর্তী দুর্যোগ মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্ধার কার্যক্রম আরও জোরদার করা দরকার। একই সঙ্গে নিখোঁজ বিদেশি নাগরিকদের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে দ্রুত তথ্য বিনিময় করতে হবে। তবে তাৎক্ষণিক উদ্ধার কার্যক্রমের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে আগাম সতর্কতা ব্যবস্থায়। পাহাড়ি নদী, হিমবাহ ও হিমবাহের হ্রদগুলোতে আধুনিক সেন্সর, স্যাটেলাইট ও স্বয়ংক্রিয় পর্যবেক্ষণব্যবস্থা স্থাপন করা যেতে পারে। পানি দ্রুত বাড়লে বা হিমবাহের হ্রদ ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিলে স্থানীয় প্রশাসন, বাসিন্দা ও পর্যটকদের মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন মাধ্যমে তাৎক্ষণিক সতর্কবার্তা পাঠানোর ব্যবস্থা থাকতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীকেও প্রস্তুত করতে হবে। এর পাশাপাশি পাহাড় কাটা, অপরিকল্পিত সড়ক নির্মাণ, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নির্বিচারে স্থাপনা নির্মাণ বন্ধ করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রাকৃতিক ঝুঁকির সঙ্গে মানুষের অপরিকল্পিত কর্মকাণ্ড যুক্ত হলে দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি বহুগুণ বেড়ে যায়। তাই পরিবেশসম্মত ভূমি ব্যবহার ও পাহাড়ি অবকাঠামো পরিকল্পনা নিশ্চিত করা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানোর বৈশ্বিক উদ্যোগের পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অভিযোজন সক্ষমতা বাড়ানোও প্রয়োজন। নেপালের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিতে উন্নত দেশগুলোর এগিয়ে আসা উচিত। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনে যাদের অবদান তুলনামূলক কম, ক্ষতির বোঝা অনেক সময় তাদেরই বেশি বহন করতে হয়।
নেপাল-চীন সীমান্তের এই দুর্যোগ তাই শুধু একটি অঞ্চলের বন্যা বা ভূমিধসের ঘটনা নয়; এটি বদলে যাওয়া জলবায়ুর বাস্তবতার প্রতি আরেকটি সতর্কবার্তা। প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়, কিন্তু বিজ্ঞানভিত্তিক পূর্বাভাস, আগাম সতর্কতা, নিরাপদ অবকাঠামো এবং আন্তর্দেশীয় সমন্বয়ের মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব। এখন প্রয়োজন দুর্যোগের পর তৎপর হওয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে দুর্যোগের আগেই প্রস্তুতি নেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তোলা। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় এ পথেই হতে পারে টেকসই সমাধান।
আইএনবি/বিভূঁইয়া
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক : ব্যারিস্টার জাকির আহাম্মদ, অফিস : ১৪ কাকরাইল রোড, (৫ম তলা) শান্তিনগর বাজার, ঢাকা-১২১৭। মোবাইল : ০১৮১৭০৬২৩৪৪, ০১৭১২৩৫৭১৫৪ ইমেইল : inbnews2010@gmail.com
© All rights reserved © INBNews