নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালেন তৃতীয় লিঙ্গের প্রার্থী রানী

রংপুর প্রতিনিধি: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণার শেষ মুহূর্তে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন রংপুর-৩ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী হিজড়া জনগোষ্ঠীর আনোয়ারা ইসলামী রানী।

শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় রংপুর নগরীর নূরপুরে ‘ন্যায় অধিকার তৃতীয় লিঙ্গ উন্নয়ন সংস্থার’ নিজস্ব কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই সিদ্ধান্তের কথা জানান।

আনোয়ারা ইসলাম রানী বলেন, হিজড়া জনগোষ্ঠীসহ সকল সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত আসনের দাবিতে আমি রংপুর-৩ আসন থেকে আমার প্রার্থিতা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিচ্ছি। এ সময় প্রার্থিতা প্রত্যাহারের প্রেক্ষিতে ‘হরিণ’ প্রতীকে ভোট না দেওয়ার জন্য তিনি আহ্বানও জানান।

তিনি বলেন, সব রাজনৈতিক দল, প্রার্থী, তাদের সমর্থক এবং আমার নির্বাচনী কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকদের প্রতি অনুরোধ জানাচ্ছি আমার এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে যেন কোথাও কোনো ধরনের উত্তেজনা, সংঘাত বা অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয়। আমরা শান্তিপূর্ণ, সৌহার্দ্যপূর্ণ ও সহনশীল রাজনৈতিক পরিবেশে বিশ্বাস করি।

কারো সঙ্গে আপোষ কিংবা বিক্রি না হয়ে বৈষম্যের প্রতিবাদ জানাতে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন দাবি করে রানী আরও বলেন, আমাকে ভুল বুঝবেন না, কষ্ট পাবেন না। আপনাদের রানী কারো কাছে বিক্রি হয় না, কারো সঙ্গে আপোষ করে না। এটি কোনো বিদায় নয়; এটি বৈষম্যের বিরুদ্ধে একটি দৃঢ়, নীতিগত ও শান্তিপূর্ণ অবস্থান। একই সঙ্গে আমার এই যৌক্তিক দাবির পক্ষে সংহতি জানিয়ে আমার হাতকে শক্তিশালী করবেন, যাতে করে হিজড়া জনগোষ্ঠীসহ সকল প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত আসনের সাংবিধানিক স্বীকৃতি আদায় করা সম্ভব হয়।

সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে আনোয়ারা ইসলাম রানী বলেন, সময়ের পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভাগ্যের প্রত্যাশিত পরিবর্তন এখনো হয়নি। রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক কাঠামোর সীমাবদ্ধতার কারণে আমাদের মৌলিক অধিকারগুলো দীর্ঘদিন ধরে নিশ্চিত হয়নি, ফলে আমাদের ‘পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আমি এই শব্দটিকে সমর্থন করি না। আমরা পিছিয়ে পড়া নই, পিছিয়ে রাখা। আমরা কেউ সমাজের বোঝা হয়ে থাকতে চাই না। আমরা মূলধারায় মর্যাদাপূর্ণ অংশগ্রহণ চাই।

তিনি আরও বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে সরকারের নিকট এবং জুলাই জাতীয় সনদ এর ভবিষ্যতের পথরেখা প্রণয়নের পূর্বেই আমাদের জন্য অ্যাফারমেটিভ অ্যাকশন প্রয়োগের দাবি জানিয়ে আসছি। অ্যাফারমেটিভ অ্যাকশন হলো এমন একটি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ, যার মাধ্যমে দীর্ঘদিন পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীকে মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করতে জাতীয় সংসদে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা করা হয়। নারীদের ক্ষেত্রেও একসময় এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

হিজড়া জনগোষ্ঠীকে সামনে থেকে প্রতিনিধিত্ব করা এই মানবাধিকারকর্মী বলেন, ১৯৭৩ সালে যেখানে ১৫টি সংরক্ষিত আসন ছিল, তা পর্যায়ক্রমে বেড়ে আজ ৫০টিতে পৌঁছেছে। এর ফলশ্রুতিতে আমাদের মা ও বোনেরা সমাজ ও রাষ্ট্রের নানা ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখে অগ্রগতি অর্জন করছে। কিন্তু ৫০টি সংরক্ষিত আসনে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য কোন সংরক্ষিত আসন দেয়া হয়নি। নারীদের পাশাপাশি হিজড়া সম্প্রদায়সহ সকল প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সংরক্ষিত আসনের দাবি জানাচ্ছি। আমরাও সমাজের বোঝা হয়ে থাকতে চাই না। আমাদের প্রান্তিকতা থেকে মুক্তি দেওয়া হোক।

আনোয়ারা ইসলাম রানী বলেন, যুগের পর যুগ ধরে বাংলাদেশে হিজড়া জনগোষ্ঠী, আদিবাসী, হরিজনসহ বিভিন্ন প্রান্তিক জনগোষ্ঠী নিজ দেশেই মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত এবং নানাবিদ বঞ্চনার শিকার। পৈত্রিক সম্পত্তি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানে তারা বৈষম্যের শিকার হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। সামাজিক বঞ্চনা একসময় এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে লাশ দাফন করতেও বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে, যা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। আমরা এই প্রান্তিকতার অবসান চাই।

উল্লেখ্য; আনোয়ারা ইসলাম রানী ন্যায় অধিকার তৃতীয় লিঙ্গ উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি এবং রূপান্তরের উদ্যোক্তা। তিনি সবশেষ ২০২৪ সালের দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে রংপুর-৩ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশ নিয়ে চমক দেখিয়েছেন। ওই নির্বাচনে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের ৮১ হাজার ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। আনোয়ারা ইসলাম রানী ‘ঈগল’ প্রতীক নিয়ে ২৩ হাজার ভোট পেয়ে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হন।

আইএনবি/বিভূঁয়া