আইএনবি ডেস্ক: গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি নিহিত থাকে জনগণের অবাধ, স্বাধীন ও সচেতন মত প্রকাশে। একটি নির্বাচন তখনই সুষ্ঠু ও অর্থবহ হয়, যখন ভোটার নির্ভয়ে ভোট দিতে পারেন এবং সেই ভোটের সিদ্ধান্ত নেন সত্য, নির্ভরযোগ্য ও যাচাইকৃত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে। সুষ্ঠু নির্বাচন কেবল ব্যালট বাক্সে ভোট পড়ার আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি আসলে সত্যের সঙ্গে জনগণের আস্থার এক গভীর সম্পর্ক। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো—বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে সেই আস্থার ভিত্তিই সবচেয়ে বড় হুমকির মুখে পড়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) প্রযুক্তির বিস্ময়কর অগ্রগতি একদিকে যেমন মানবজীবনকে সহজ ও গতিশীল করছে, অন্যদিকে তেমনি গণতন্ত্র ও নির্বাচন ব্যবস্থার জন্য তৈরি করছে ভয়ংকর ঝুঁকি। বিশেষ করে এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া ভিডিও, অডিও ও ছবি, যা ‘ডিপফেক’ নামে পরিচিত—এখন আর কেবল প্রযুক্তিগত কৌতূহল নয়; বরং এটি গণতন্ত্রকে দুর্বল করার একটি শক্তিশালী অস্ত্রে পরিণত হয়েছে।
এআই প্রযুক্তির সাহায্যে এমন ভিডিও বা অডিও তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে, যা দেখলে বা শুনলে সাধারণ মানুষের পক্ষে আসল ও নকলের পার্থক্য করা প্রায় অসম্ভব। কোনো রাজনৈতিক নেতার মুখে এমন বক্তব্য বসিয়ে দেওয়া যায়, যা তিনি কখনো বলেননি।
এমন দৃশ্য তৈরি করা যায়, যা বাস্তবে ঘটেনি। এসব ভুয়া কনটেন্ট মুহূর্তের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং সত্য যাচাইয়ের সুযোগ পাওয়ার আগেই জনমনে বিভ্রান্তি ও সন্দেহের বীজ বপন করে।
এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে—যখন সত্য নিজেই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তখন একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন কীভাবে সম্ভব? এআইয়ের অপব্যবহার সেই প্রশ্নটিকেই আজ গণতন্ত্রের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড় করিয়েছে।
বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও সাবেক গুগল সিইও এরিক শ্মিট একবার সতর্ক করে বলেছিলেন—“এআই মানুষের চেয়ে বুদ্ধিমান হয়ে উঠবে—এটাই সবচেয়ে বড় বিপদ নয়; বরং যাচাই ছাড়াই মানুষ এআই-তৈরি তথ্যকে সত্য বলে বিশ্বাস করবে, এটাই আসল ঝুঁকি।
এই বক্তব্য আজকের নির্বাচনী বাস্তবতায় ভয়াবহভাবে প্রাসঙ্গিক।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোতে ডিপফেকের অপব্যবহার প্রমাণ করেছে—এটি কেবল প্রযুক্তিগত সমস্যা নয়, বরং সরাসরি রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন, ভারতের লোকসভা ভোট, তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া, তাইওয়ান, ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে ডিপফেক ও এআই-ভিত্তিক অপতথ্য নির্বাচনী পরিবেশকে বিষাক্ত করে তুলেছে। ভোটারদের বিভ্রান্ত করা, প্রার্থীর ভাবমূর্তি ধ্বংস করা কিংবা ভোট বর্জনে উসকানি দেওয়ার মতো কাজগুলো এখন এআইয়ের মাধ্যমে আগের চেয়ে অনেক সহজ ও কার্যকর হয়ে উঠেছে।
অক্সফোর্ড ইন্টারনেট ইনস্টিটিউটের গবেষক সামান্থা ব্র্যাডশ এক প্রতিবেদনে বলেছেন—“নির্বাচনের লড়াই এখন ক্রমেই ডিজিটাল যুদ্ধক্ষেত্রে রূপ নিচ্ছে, যেখানে সত্যের চেয়ে মিথ্যা অনেক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এআই ভিডিওর হুমকি কোনো কল্পনাপ্রসূত আশঙ্কা নয়; এটি ইতোমধ্যেই বাস্তব রূপ নিয়েছে।
২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে অনেকেই ‘ডামি ভোট’ নামে অভিহিত করেছেন। সেই নির্বাচনের দিনই গাইবান্ধা-১ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী আবদুল্লাহ নাহিদ নিগারের একটি ভুয়া ডিপফেক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে তাঁকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিতে দেখা যায়। ভোটের দিন সকালে ছড়িয়ে পড়া এমন ভিডিও স্বাভাবিকভাবেই ভোটারদের বিভ্রান্ত করে এবং পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে।
এই ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন উদাহরণ নয়। এটি স্পষ্ট করে দেখিয়েছে—বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে ডিজিটাল সাক্ষরতা তুলনামূলকভাবে দুর্বল, সেখানে ডিপফেক কতটা বিপজ্জনক হতে পারে। ফ্যাক্টচেকাররা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রে একটি মাত্র ভুয়া ভিডিওই যথেষ্ট—ভোটারদের সিদ্ধান্ত পাল্টে দিতে, উত্তেজনা সৃষ্টি করতে কিংবা সহিংসতার পথ খুলে দিতে।
ডিপফেকের পাশাপাশি বাংলাদেশে আরেকটি বড় সমস্যা হলো তথাকথিত ‘চিপফেক’। এগুলো সব সময় উন্নত এআই দিয়ে তৈরি না হলেও সস্তা সফটওয়্যার, এডিটিং কৌশল কিংবা পুরোনো ছবি-ভিডিও ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর বার্তা ছড়ানো হয়। সত্য ভিডিওর সঙ্গে ভিন্ন অর্থবাহী ক্যাপশন জুড়ে দেওয়া, বক্তব্যের অংশবিশেষ কেটে প্রসঙ্গ বদলে দেওয়া, মনগড়া উদ্ধৃতি চালিয়ে দেওয়া—এসব কৌশল এখন রাজনৈতিক অপপ্রচারের নিত্যদিনের অস্ত্র।
বিশ্বখ্যাত এআই গবেষক ইয়োশুয়া বেনজিও এক সাক্ষাৎকারে বলেন—
“ডিপফেক সমাজের বিশ্বাসের ভিত্তিকেই ধ্বংস করে দেয়”।
তথ্য যাচাইকারী সংস্থাগুলোর বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসে, অপতথ্যের প্রধান মাধ্যম হিসেবে ভিডিওই সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। কারণ মানুষ এখন লিখিত খবরের চেয়ে দৃশ্যমান কনটেন্টে বেশি আস্থা রাখে। এই মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতাই এআই অপব্যবহারকারীদের সবচেয়ে বড় শক্তি।
বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ১৩ কোটি। ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মে কোটি কোটি মানুষ সক্রিয়। এই বিশাল ডিজিটাল জনসমষ্টির মধ্যে যদি পরিকল্পিতভাবে ভুয়া ভিডিও ছড়ানো হয়, তার প্রভাব কল্পনাতীত। বিভিন্ন ফ্যাক্টচেকিং সংস্থার প্রতিবেদনে দেখা গেছে, নির্বাচনের আগের সময়ে শনাক্ত হওয়া ভুল তথ্যের বড় অংশই ছিল ভিডিওভিত্তিক এবং সেগুলোর বেশির ভাগই সরাসরি মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই মিথ্যাগুলো শুধু সাধারণ মানুষই নয়, অনেক সময় রাজনৈতিক নেতা ও গণমাধ্যমও যাচাই না করেই বিশ্বাস করছে। ফলে অপতথ্য এক স্তর পেরিয়ে আরেক স্তরে প্রবেশ করছে এবং শেষ পর্যন্ত তা ‘সত্য’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, অপতথ্যের পেছনে সাধারণত দুই ধরনের শক্তি কাজ করে। একদল রাজনৈতিক বা আদর্শিকভাবে অনুপ্রাণিত। আরেক দল অর্থের বিনিময়ে কাজ করে। ভুয়া পরিচয়ে খোলা শত শত ফেসবুক পেজ ও অ্যাকাউন্ট নিয়ে গড়ে উঠেছে তথাকথিত ‘বটবাহিনী’, যারা সমন্বিতভাবে একই মিথ্যা তথ্য ছড়ায়। এদের অনেকের অবস্থান দেশের বাইরে হলেও লক্ষ্য থাকে বাংলাদেশের রাজনীতি ও নির্বাচন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও স্বীকার করছে—নিষিদ্ধ রাজনৈতিক শক্তি ও স্বার্থান্বেষী মহল অনলাইনে সক্রিয়ভাবে অপতথ্য ছড়াচ্ছে। কিন্তু সমস্যা হলো, অ্যাকাউন্ট বা পেজ শনাক্ত করা গেলেও এর নেপথ্যের কারিগরদের আইনের আওতায় আনা অত্যন্ত কঠিন।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে স্পষ্টভাবে বলা আছে, ভোটারকে বিভ্রান্ত করতে এআই ব্যবহার করে মিথ্যা বা মানহানিকর কনটেন্ট তৈরি ও প্রচার নিষিদ্ধ। নির্বাচন কমিশন, সাইবার সুরক্ষা সংস্থা ও পুলিশ—সবাই এআই অপব্যবহারের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। হটলাইন, বিশেষ সেল ও নজরদারির কথাও বলা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এখন পর্যন্ত কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ খুব কমই চোখে পড়েছে।
এর ফলে সেনা পোশাক পরা এআই-তৈরি ভিডিও, ধর্মীয় সংখ্যালঘু বা নারীদের নিয়ে ভুয়া ভিডিও, এমনকি পশুর মুখে ভোটের আহ্বান—সবই নির্বিঘ্নে ছড়িয়ে পড়ছে। সেনাবাহিনী পর্যন্ত সতর্কতা জারি করলেও সেই ভিডিওগুলো অনলাইনে থেকে যাচ্ছে এবং লাখ লাখ মানুষ তা দেখছে।
এআই ভিডিওর সবচেয়ে বড় বিপদ হলো—এটি বিশ্বাসের ভিত্তিকে ভেঙে দেয়। মানুষ যখন আর নিশ্চিত হতে পারে না কোনটি সত্য আর কোনটি বানানো, তখন গণতন্ত্রের মূল শক্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে। নির্বাচন নিয়ে সন্দেহ, প্রার্থীর বিরুদ্ধে ক্ষোভ, সহিংসতার আশঙ্কা—সবকিছুই এই অবিশ্বাসের পরিবেশ থেকে জন্ম নিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো প্রার্থীকে হেয় করে ভুয়া ভিডিও ছড়ানো হলে তাঁর সমর্থকেরা প্রতিক্রিয়ায় নামতে পারেন। আবার কাউকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেওয়ানো হলে এলাকায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে। এভাবেই এআই ভিডিও নির্বাচনকে শুধু প্রশ্নবিদ্ধই নয়, অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে শুধু আইন থাকলেই চলবে না; তার কঠোর ও দ্রুত প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচন কমিশনের উচিত প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে বিশেষায়িত টাস্কফোর্স গঠন করা, যারা তাৎক্ষণিকভাবে ভুয়া কনটেন্ট শনাক্ত ও অপসারণে কাজ করবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে সরাসরি সমন্বয় বাড়াতে হবে, যাতে সন্দেহজনক কনটেন্ট দ্রুত নামানো যায়।
একই সঙ্গে নাগরিকদের ডিজিটাল সাক্ষরতা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। মানুষকে শেখাতে হবে—কীভাবে সন্দেহজনক ভিডিও শনাক্ত করবেন, কীভাবে যাচাই করবেন এবং কীভাবে গুজব ছড়ানো থেকে বিরত থাকবেন। যাচাই ছাড়া কনটেন্ট শেয়ার না করার সংস্কৃতি গড়ে তোলা ছাড়া বিকল্প কোনো পথ নেই।
এআই প্রযুক্তি নিজে কোনো শত্রু নয়; শত্রু হলো এর অপব্যবহার। কিন্তু নির্বাচনকালীন সময়ে এই অপব্যবহার যদি নিয়ন্ত্রণে আনা না যায়, তবে ভবিষ্যতের যেকোনো নির্বাচন আরও বেশি প্রশ্নবিদ্ধ হবে। বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে গণতন্ত্র ইতিমধ্যেই নানা চ্যালেঞ্জের মুখে, সেখানে এআই ভিডিও হতে পারে সবচেয়ে বড় অদৃশ্য হুমকি। এখনই যদি কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে সামনে এমন এক সময় আসতে পারে—যখন সত্য ও মিথ্যার সীমারেখা পুরোপুরি মুছে যাবে। সুতরাং এআই-এর অপব্যবহারকে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে এখনই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
সূত্র: বাংলা নিউজ
আইএনবি/বিভূঁইয়া