অভির সমাপ্ত ডায়রি..

না বলা কিছু অপ্রিয় সত্যি কথা

10
এমডি বাবুল ভূঁইয়া: অভি সব সময়ই তার না বলা কথা গুলো ডায়রিতে লিখে রাখতো। তেমনি একটি লেখা পড়ে খুব কস্ট লেগেছে অভির জন্য।
ডায়রিতে লেখা…
আমার নিকটতম তিন জন প্রিয় মানুষ। জাবেদ, আবেদ এবং করিম। তিনজনকেই আমি ভালোবাসে এবং শ্রদ্ধা করি। অরা তিনজনই আলাদা আলাদা করে আমার কাছে বিভিন্ন কথা বলতো। কিন্তু আমি কখনো একজনের কথা আরেকজনের কাছে বলতাম না। আমি সব সময় চেয়েছি ওরা তিনজন মিলেমিশে এক সুতোয় থাকুক। কোন এক কারনে আমি করিমের জন্য জাবেদের পায়ে ধরেও ক্ষমা চেয়েছিলাম। হয়তো করিম আজও সে কথা জানেনা।
করিম রাজনীতির মাঠে বেশ সুনাম অর্জন করেছে। আমিও চাই আমাদের স্বজনদের মধ্যে করিম তার নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে যাক। কারন করিমের রাজনীতির অবস্থানে আমাদের স্বজনদের অর্থাৎ পরিবারের কেউ এখন আর এগোতে পারবেনা। আমার নিজের স্বপ্নতো নস্ট হয়েছে। সেই স্বপ্নটা করিমের মাঝে বাস্তবে আমি পূরণ করতে চাই।
তাই আমি বরাবরই জাবেদ, আবেদ এবং করিমকে এক সুতোয় গেঁথে রাখতে চাই। আমার কাছে ওরা তিনজনই হলো এক একটা রত্ন। আর সেই রত্ন গুলোর মাঝে এক শ্রেণির স্বার্থপর মানুষ রুপি হায়েনারের দল তিন জনের মাঝে ফাটল ধরিয়ে দুরে সরিয়ে রাখতে চায় নিজ নিজ ফায়দা লুটার জন্য।
আমি নিজে রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলাম। কিন্তু একদিন সমাজ সংসারের চাপে কিংবা আমার নিজের ভুলের কারনেই হোক ছেড়ে দিতে হলো। রাজনীতি নিয়ে আমার অনেক বড় স্বপ্ন ছিলো। সেসব ইতিহাস আর বলতে চাইনা…। তাই আমার স্বপ্নটা এখন করিমকে নিয়েই।
ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে আমি করিমের অফিসেই কাজ করতে আসি। সেটাকে সবাই চাকুরী মনে করলেও কেন জানি আমি করতাম না। শত হলেও করিম আমার স্বজন। কিন্তু করিমের অফিসে কাজ করার আগে শর্ত ছিলো কখনো যেন অফিসে আমার কোন আচরণের জন্য তার মানসম্মান নষ্ট না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে। আমিও সেভাবেই চলছি।
অফিসে একজন স্টাফ ছিলো। তার নাম নিরু। সে সব স্টাফকে অযথাই খুব ডিস্টার্ব করতো। এমন ভাব করতো মনে হয় সে নিজেই প্রতিষ্ঠানের মালিক। অথচ প্রতিষ্ঠানের কাজের কিছুই সে বুঝতোনা। অফিসের সবার বেতন আগে দিলেও আমার বেতনটা দেওয়া হতো দেরি করে। কিন্তু কখনো তা নিয়ে টু শব্দটিও করিনি। আমি যে বেতনটা পেতাম সেটা অফিস সহকারীর চেয়েও কম ছিলো। পুরো বেতনের টাকাটা গাড়ি বাড়াতে খরচ হয়ে যেতো। তারপরও অফিসে থেকে গিয়েছি ভালোবাসার জন্য। আমার বেতনটা দেরিতে দেওয়া হতো তা হয়তো করিম জানতোনা। আমিও কখনো জানাইনি বা তাকে বলিনি। মাঝে মাঝে নিরু আমার সাথেও বাজেভাবে আচরণ করতো। তারপরও করিমের কথা ভেবে সহ্য করে নিতাম। কিন্তু ইচ্ছে করলে নিরুকে মিটিয়ে রক্তাক্ত করে হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়ার মতো সৎ সাহস আমার ছিলো। তা-ও করিনি। এতটাই ধৈর্য্য ধারন করে চলেছি করিমকে ভালোবেসে। শুধু করিমের দিক চিন্তা করে।
এর মধ্যে মা অসুস্থ হয়ে বিছানায় পরলো। মায়ের জন্য মন মানসিকতা কখনো ভালো থাকতোনা। এ ফাঁকে চাকুরী থেকে আমাকে নিষেধ করে দেওয়া হলো। অনেক ঝড় জঞ্জাল মোকাবেলা করতে হলো আমাকে। পারিবারিক ভাবেও সহোদরদের কাছে অপমানিত হতে হয়েছে। সেখানেও মায়ের কথা চিন্তা করে সবকিছু সহ্য করে গিয়েছি। কোন প্রতিবাদ করিনি। আমি তখন নিজেকে নিজে প্রশ্ন করতাম, আমার মতো এত রাগী ছেলেটার রাগ গুলো কোথায় গেল?
মা অসুস্থ থাকা অবস্থায় এমনকি মৃত্যুর কিছুদিন আগেও আমাকে বারবার বলেছে আমি যেন সবসময় করিমের পাশে থাকি। মা কেন বলেছিল সেই প্রশ্নের উত্তর আমি আজও খোঁজে পাইনি।
মা’য়ের দেওয়া কথা মতো করিমের কাছেই পরে রইলাম। করিম আমাকে মন থেকে পছন্দ করতো কিনা জানিনা। দীর্ঘ প্রায় এক বছর বেতনহীন করিমের অফিসে কাজ করেছি। কখনো মুখ ফোটে বলিনি আমার টাকা লাগবে। কেন জানি নিজের কাছে খুব লজ্জা লাগতো। তার আরো একটি কারন ছিল, আমি নিজেকে তার অফিসের বেতনভুক্ত কর্মচারী মনে করিনি। আমি সেই ভালোবাসার স্বজনই মনে করতাম। কিন্তু অপরিচিত কত মানুষই করিমের টাকা দিয়ে নাকে ঘি লাগিয়ে চলতো। !
হঠাৎ একদিন করিম আমাকে কাছে ডেকে নিলো। তার সাথে থাকতে বললো। আমিও সে থেকে থাকতে শুরু করি। মনে মনে স্থির করে নিয়েছি মৃত্যুর আগ পযর্ন্ত করিমের সাথেই থাকবো। জানিনা ভাগ্যে সেটা লেখা আছে কিনা। কারন কিছু স্বার্থপর মানুষ আছে, তারা মন থেকে পছন্দ করতে পারছেনা করিমের সাথে আমার থাকাটা। তাদের অনেক আচরণে এমনটাই ইঙ্গিত করে। কিন্তু পারবে বলে মনে হয়না। এখন আগের চেয়েও ধৈর্য ধরতে শিখে খেছি।
কখনো লোভ জিনিসটা আমার মাঝে কাজ করেনি। আগেও করেনি। করিমের ভালোবাসায় আমি এখন মুগ্ধ। তখন মাঝে মাঝে আবেগপ্লোত হয়ে যাই। করিমকে কেউ কিছু বললে বা তার ক্ষতি হতে পারে এমন কিছু করলে আমার মাথায় রক্ত উঠে যায়। ইচ্ছে হয় পিষে মেরে ফেলি।
করিমকে আমি এতোটাই ভালোবাসি, তার ভালোর জন্য যেকোন কাজ করতে প্রস্তুত। তা সে বুঝতে পারে কিনা আমি জানিনা।
করিম মাঝে মধ্যে আমার ছেলের জন্য এটা সেটা কিনে দেয়। তখন আমি বোবা হয়ে যাই। আমার মা-বাবার কথা খুব মনে পরে চোখে পানি চলে আসে। মনে হয় করিমের মাঝে আমার বাবা-মা বিরাজ করছে। তার কোন কস্ট দেখলে আমার সহ্য হয়না। তখন তার মুখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে পারিনা।
মাঝে মাঝে আমার বাইকের তেল শেষ হয়ে যায়। আমার কাছে তেল ডোকানোর মতো টাকাও হাতে থাকেনা। করিমের কাছে চাইলে এখন আর সে না করবেনা জানি। তবুও চাইতে পারিনা…। নিজের কাছে বিব্রত লাগে।
আমি এখনো তার কর্মচারী হিসেবে নিজেকে নিতে পারিনি। ভবিষ্যতেও হয়তো পারবো না। কারন সে যে আমার অবিভাবক। অবিভাবকের কাছে নিজেকে কর্মচারী বা স্টাফ কি করে মনে করি?
সে যে আমার খুব কাছের স্বজন। আমার প্রিয় ভালোবাসার মানুষ….। অথচ আজ কস্ট লাগছে খুব। খুব কস্ট পেয়েছি…করিম কি এখনো আমাকে চিনতে পারেনি? আমি আসলে কি…
(অসমাপ্ত কাব্য)