শবে বরাত করোনা মুক্তির বার্তা বয়ে আনুক

ধর্ম ডেস্ক: বছর ঘুরে আবার হাজির হয়েছে লাইলাতুম মিন নিসফি শাবান (শাবান মাসের মধ্যবর্তী রাত)। যা আমাদের দেশে শবে বরাত নামে সমধিক পরিচিত। ফার্সি শব অর্থ রাত্রি এবং বরাত অর্থ মুক্তি। অতএব, শবে বরাতের অর্থ হলো- মুক্তির রাত।

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে কার্যত থমকে আছে বিশ্ব। দেশে দেশে মানুষ ঘরবন্দি। জীবন স্থবির হলেও চাঁদের আবর্তনে বছর ঘুরে এসেছে মহিমান্বিত রাত। করোনা ঠেকাতে গত ২৬ মার্চ থেকে চলছে সাধারণ ছুটি। আগামী ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠান বন্ধ। এ বছর শবে বরাতের ছুটি পড়ে গেছে করোনার বন্ধে। অন্যদিকে নতুন আবহে এবার পালন করতে হচ্ছে শবে বরাত। অনেকেই বিশ্বাস করেন, এ রাতে ভাগ্য নির্ধারিত হয়। সে হিসেবে আমরা বলতে পারি, করোনা মুক্তি আর বিশ্ববাসীর জন্য সামগ্রিক কল্যাণের বার্তা নিয়ে এসেছে শবে বরাত। আমাদের প্রত্যাশাও তাই।

শবে বরাতের পবিত্রতা রক্ষা ও শান্তিপূর্ণভাবে উদযাপন নিশ্চিত করতে প্রতিবছরই ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ আতশবাজি, পটকাবাজি, অন্যান্য ক্ষতিকারক ও দূষণীয় দ্রব্য বহন এবং ফোটানো নিষিদ্ধ করে থাকে। এবার নেই তেমন কোনো বিজ্ঞপ্তি, কিন্তু রয়েছে ঘরে থাকার কড়া নির্দেশনা। সামাজিক দূরত্ব রক্ষায় পথে পথে রয়েছে পুলিশ।

২০১৯ সালে কেউ কি ভাবতে পেরেছিল ২০২০ সালের শবে বরাত পালন করতে হবে ঘরে? মসজিদগুলো খালি থাকবে, মৃত আত্মীয়-স্বজনের কবর জিয়ারত করা যাবে না। ইবাদত-বন্দেগির মিশেলে একটা উৎসবের আবহ হারিয়ে যাবে। কিংবা কারও কল্পনায় ছিলো, এমন প্রাণঘাতী এক ভাইরাস অপেক্ষা করছে মানবজাতির জন্য। করোনার কথা তখন কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। এবার শবে বরাতের নফল ইবাদত-বন্দেগি বাসায় পালন করতে মুসল্লিদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন। সরকারিভাবে ঘরে থাকার সরকারি নির্দেশনাও রয়েছে। এ বিষয়ে দেশের শীর্ষ আলেম আল্লামা আহমদ শফীও পৃথক বিবৃতি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, শবে বরাতের রাতে যে ইবাদত করা হয় তা ফরজ কিংবা সুন্নত নয়, নফল। নফল ইবাদত ঘরে পালন করাই উত্তম।

শবেবরাত উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পৃথক বাণী দিয়েছেন।

ঘরে শবে বরাতের ইবাদত করার আহ্বান জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেছেন, প্রার্থনা করি পরম করুণাময় যেন বিশ্ববাসীকে এ মহামারি থেকে রক্ষা করেন। শবে বরাতের মাহাত্ম্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে মানব কল্যাণ ও দেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

অন্যান্য বছর শবে বরাতে রাতভর ওয়াজ-নসিহত করা হয় বায়তুল মোকাররমসহ দেশের সব মসজিদে। দলে দলে তরুণ-যুবারা রাতভর ঘুরে ঘুরে নামাজ আদায় করেন মসজিদে মসজিদে। করোনার বিস্তার ঠেকাতে এবার তা করা যাবে না। এবার সরকারি কোনো কর্মসূচি নেই। নেই উৎসবের আমেজে শবে বরাত পালনের কোনো প্রস্তুতি। জনসমাগম হয় এমন কোনো আয়োজন নেই। শবে বরাতে অনেকে আত্মীয়-স্বজনের কবর জিয়ারত করেন। ইসলামিক ফাউন্ডেশন এবার আহ্বান জানিয়েছে, কবর জিয়ারত থেকে বিরত থাকতে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্দেশ দিয়েছে কবরস্থানে যাওয়া যাবে না। শবে বরাত উপলক্ষে অনেকে আজ ও আগামীকাল রোজা রাখবেন।

ইসলামি স্কলারদের মতে, যেহেতু আল্লাহতায়ালা এ রাতে বান্দাদেরকে ডেকে ডেকে রোগ-শোক, অভাব-অনটন, বিপদ-আপদ ও গোনাহ থেকে মুক্তি দিয়ে থাকেন, তাই এ রাতকে শবে বরাত বলা হয়। এ রাতে আল্লাহতায়ালা আগামী এক বছরের জন্য মানুষের জীবন-মৃত্যু, ধন-সম্পদ ইত্যাদির ফায়সালা করে থাকেন।

বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাসের মরণছোবল যখন ২১০টি দেশে আঘাত হেনেছে এবং মুসলিম জাহানের সর্বত্র এর প্রভাব দিন দিন সম্প্রসারিত হচ্ছে, এমতাবস্থায় সকল মুমিন-মুসলমানের উচিত আজ রাতে ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে আল্লাহপাকের দরবারে ক্ষমা ভিক্ষা করা ও রহমত প্রত্যাশা করা। অদৃশ্য ভাইরাস থেকে মুক্তি ও নিষ্কৃতি লাভের জন্য কায়মনে দোয়া করা। কেননা, মহামহিম আল্লাহপাকই সর্বশক্তিমান ও ক্ষমাকারী। আল্লাহতায়ালা আমাদেরকে ক্ষমা করুন, গোনাহ থেকে পবিত্র করুন, করোনার ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করুন, সুখ শান্তি ও সমৃদ্ধিতে ভরিয়ে দিন বিশ্ববাসীকে- এটাই হোক আজকের একান্ত প্রত্যাশা। কান্নায় বুকভেজানো মুমিন-মুসলমানের আর্তি, আবাল বৃদ্ধ বণিতার ফরিয়াদ।

আইএনবি/বিভূঁইয়া