আইএনবি ডেস্ক: যাকাত নির্ধারিত আর্থিক ফরজ ইবাদত। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘তাদের ধনসম্পদে আছে প্রার্থী ও বঞ্চিতের হক বা ন্যায্য অধিকার।’ (সুরা–৫১ জারিয়াত, আয়াত: ১৫–১৯) ‘যাদের ধনসম্পদে নির্ধারিত হক আছে যাঞ্চাকারী ও বঞ্চিতদের।’ (সুরা–৭০ মাআরিজ, আয়াত: ২২–২৭)
যাকাত সম্পদের প্রবাহ তৈরি ও দারিদ্র্য বিমোচন করে। সঠিকভাবে যাকাত প্রদান করলে সমাজ, দেশ, জাতি ও রাষ্ট্র এবং বিশ্ব দারিদ্র্যমুক্ত হবে। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘যাতে তোমাদের বিত্তবানদের মধ্যেই শুধু সম্পদ আবর্তন না করে।’ (সুরা–৫৯ হাশর, আয়াত: ৭)
নবীজি (সা.) বলেন, ‘দাতা আল্লাহর কাছে প্রিয়, মানুষের কাছে প্রিয়, জান্নাতের নিকটতম; জাহান্নাম থেকে দূরে। সাধারণ দাতা অধিক ইবাদতকারী কৃপণ অপেক্ষা আল্লাহর কাছে বেশি প্রিয়।’ (তিরমিজি)
আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘মূলত সদকা হলো ফকির, মিসকিন, জাকাত কর্মী, অনুরক্ত ব্যক্তি ও নওমুসলিম, ক্রীতদাস, ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি, আল্লাহর পথে (ইসলামের সুরক্ষার জন্য) ও বিপদগ্রস্ত বিদেশি মুসাফির ও পথসন্তানদের জন্য। এটি আল্লাহর মাধ্যমে নির্ধারিত। আর আল্লাহ সর্বজ্ঞানী ও পরম কৌশলী।’ (সুরা–৯ তাওবাহ, আয়াত: ৬০)
যাকাত বা দান প্রদানের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয়তা ও ফলাফল বিবেচনা করে নিকটাত্মীয়, প্রতিবেশী এবং অন্যদের অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। শরিয়তের বিধান পালনের পাশাপাশি নিয়তের ওপর নির্ভর করে অনেক ক্ষেত্রে সওয়াবের পরিমাণও বৃদ্ধি পায়।
যার মাধ্যমে উপকার যত বেশি মানুষের কাছে পৌঁছায়, তার সওয়াবও তত বেশি হয়। উদাহরণস্বরূপ, দ্বীনি ইলম অর্জনে নিয়োজিত কোনো দরিদ্র তালেবে এলেম বা অভাবী আলেমকে সহায়তা করলে তিনি একদিকে একজন দরিদ্র ব্যক্তি হিসেবে উপকৃত হন। পাশাপাশি দ্বীনি শিক্ষা অর্জন ও ধর্মীয় কাজের প্রচার-প্রসারে অবদান রাখার কারণে অতিরিক্ত সওয়াবও অর্জিত হয়।
৪ ধরনের সম্পদের যাকাত দিতে হয়
যাকাত ওয়াজিব হয় বর্ধনশীল সম্পদের ওপর, যা সাধারণত চার ধরনের হয়ে থাকে— ১. স্বর্ণ; ২. রৌপ্য; ৩. ব্যবসার পণ্য; ৪. নগদ অর্থ।
যেভাবে যাকাতের হিসাব করবেন
আপনার কাছে যদি এক বছর ধরে নেসাব পরিমাণ বর্ধনশীল সম্পত্তি অর্থাৎ ৭ তোলা বা ৮৭.৪৫ গ্রাম বা এর বেশি স্বর্ণ অথবা সাড়ে ৫২ তোলা বা ৬১২.৩৫ গ্রাম রৌপ্য থাকে অথবা এই পরিমাণ স্বর্ণ বা রৌপ্যের সমপরিমাণ নগদ অর্থ থাকে, তাহলে ইসলামের দৃষ্টিতে আপনি সম্পদশালী ব্যক্তি গণ্য হবেন এবং আপনার ওপর যাকাত আদায় করা ফরজ।
নগদ অর্থ, স্বর্ণ-রৌপ্য বা ব্যবসার সম্পদ যেদিন নেসাব পরিমাণে পৌঁছাবে, সেদিন থেকেই যাকাতের বর্ষগণনা শুরু করতে হবে। যাকাতের বর্ষ পূর্ণ হওয়ার দিনে অর্থাৎ ওই পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়ার ঠিক এক বছর পর আপনার মালিকানায় যে পরিমাণ বর্ধনশীল সম্পদ—নগদ অর্থ, ব্যবসার পণ্য, স্বর্ণ বা রৌপ্য থাকবে, তার ৪০ ভাগের ১ ভাগ বা ২.৫ শতাংশ যাকাত হিসেবে দান করতে হবে।
এক বছর ধরে নেসাব পরিমাণ সম্পত্তির মালিক থাকলে যাকাতবর্ষ পূর্ণ হওয়ার পর আপনার মালিকানাধীন সমুদয় বর্ধনশীল সম্পদের যাকাত দিতে হবে; শুধু যে সম্পদ এক বছর ধরে আপনার কাছে রয়েছে ওই সম্পদের নয়। বছরের শেষে বা মাঝামাঝি সময়ে কিছু অর্থ বা স্বর্ণ লাভ করে থাকলে তাও যাকাতের হিসাবের সঙ্গে যুক্ত হবে।
স্থাবর সম্পত্তি যেমন জমি, বাড়ি ইত্যাদির ওপর যাকাত ওয়াজিব হয় না, যদি সেগুলো ব্যবসার পণ্য না হয়। একইভাবে যে গাড়ি বা বাড়ি ভাড়া দেওয়া হয়, সেই গাড়ি বা বাড়ির ওপর যাকাত দিতে হয় না, কারণ এগুলো ব্যবসার পণ্য নয়; তবে সেগুলো থেকে প্রাপ্ত ভাড়ার অর্থ জমে নেসাব পরিমাণ হলে তার ওপর যাকাত দিতে হবে।
সদকাতুল ফিতর আদায়ের পদ্ধতি
ইসলামের দৃষ্টিতে রমজানের শেষে নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিকের ওপর সদকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব।
পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘সাফল্য লাভ করবে সে, যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করে, আর তার প্রতিপালকের নাম স্মরণ করে ও নামাজ কায়েম করে।’ (সুরা : আ‘লা, আয়াত : ১৪-১৫)
ইমাম ইবন কাসির (রহ.) উল্লেখ করেছেন, উমর ইবনে আবদুল আজিজ (রহ.) মানুষকে ফিতরার যাকাত দিতে বলতেন এবং এই আয়াত তিলাওয়াত করতেন। হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, ইবনে ওমর (রা.) বলেন, ‘রাসুল (সা.) সদকাতুল ফিতর অপরিহার্য করেছেন। এর পরিমাণ হলো, এক সা জব বা এক সা খেজুর।
ছোট-বড়, স্বাধীন-পরাধীন সবার ওপরই এটি ওয়াজিব।’ (বুখারি, হাদিস : ১৫১২)
যাকাতের মতো সদকাতুল ফিতরও একটি আর্থিক ইবাদত। পবিত্র মাহে রমজানে সিয়াম পালন করতে গিয়ে সাধারণত আমাদের অনেক ভুলত্রুটি হয়ে যায়। সেই ত্রুটি-বিচ্যুতির ক্ষতিপূরণ হিসেবে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে নির্ধারিত একটি ইবাদতের নাম সদকাতুল ফিতর। এটি পরম করুণাময় মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি পবিত্র উপহারও বটে।
হাদিস শরিফে সদকাতুল ফিতরকে কাফফারাতুন লিসসাওম, অর্থাৎ রোজা অবস্থায় অবচেতনভাবে যে ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়ে যায়, তার কাফফারা বা ক্ষতিপূরণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তা ছাড়া এটি সেই দান, যা ঈদের খুশিতে ধনী-গরিব সবাইকে অংশীদার করে এবং অভাবীদের সহায়তা করে।
কার ওপর ওয়াজিব: সদকাতুল ফিতরের নিসাব যাকাতের নিসাবের সমপরিমাণ। অর্থাৎ কারো কাছে সাড়ে সাত ভরি সোনা বা সাড়ে বায়ান্ন ভরি রুপা অথবা তার সমমূল্যের নগদ অর্থ কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের অতিরিক্ত সম্পদ ঈদুল ফিতরের দিন সুবহে সাদিকের সময় বিদ্যমান থাকলে তার ওপর সদকাতুল ফিতর ওয়াজিব হবে। যার ওপর সদকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব, তিনি নিজের পক্ষ থেকে যেমন আদায় করবেন, তেমনি নিজের অধীনদের পক্ষ থেকেও আদায় করবেন। তবে এতে যাকাতের মতো বর্ষ অতিক্রম হওয়া শর্ত নয়। (ফাতহুল ক্বাদির : ২/২৮১)
এমনকি পবিত্র রমজানের শেষ দিনেও যে নবজাতক দুনিয়ায় এসেছে কিংবা কোনো ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করেছে, তার পক্ষ থেকেও সদকাতুল ফিতর আদায় করতে হবে। (ফাতাওয়া আলমগিরি : ১/১৯২)
সদকাতুল ফিতরের পরিমাণ: এর পরিমাণ সম্পর্কে শরিয়তে দুটি মাপকাঠি নির্ধারণ করা হয়েছে; তা হচ্ছে ‘এক সা’ বা ‘নিসফে সা’। খেজুর, পনির, জব ও কিশমিশ দ্বারা আদায়ের ক্ষেত্রে এক সা =৩২৭০.৬০ গ্রাম (প্রায়) অর্থাৎ তিন কেজি ২৭০ গ্রামের কিছু বেশি। এ ছাড়া গম দ্বারা আদায় করতে চাইলে ‘নিসফে সা’=১৬৩৫.৩১৫ গ্রাম বা ১.৬৩৫৩১৫ কেজি (প্রায়) অর্থাৎ এক কেজি ৬৩৫ গ্রামের কিছু বেশি প্রযোজ্য হবে। (আওজানে শরইয়্যাহ, পৃ. ১৮)
আমাদের দেশে সতর্কতামূলক এক সা = তিন কেজি ৩০০ গ্রাম, আর আধা সা = এক কেজি ৬৫০ গ্রাম হিসাব করা হয়।
যাদের যাকাত, সদকাতুল ফিতর, ওয়াজিব সদকা, ফিদিয়া, কাফফারা ও মানত প্রদান করা যায় না; তারা হলেন মাতা–পিতা ও ঊর্ধ্বতন পুরুষ, যেমন দাদা–দাদি ও নানা–নানি। ছেলে–মেয়ে ও অধস্তন পুরুষ, যেমন নাতি–নাতনি। স্ত্রীকেও জাকাত ও সদকা প্রদান করা যায় না। কারণ, তার অন্ন, বস্ত্র ও বাসস্থান স্বামীর দায়িত্বে।
আপন ভাই–বোন, ভাগনে–ভাগনি, ভাতিজা–ভাতিজি, চাচা, জেঠা, ফুফু, মামা, খালা; চাচাতো, জেঠাতো ভাই–বোন, ফুফাতো ভাই–বোন, মামাতো ও খালাতো ভাই–বোন এবং অন্যান্য নিকটাত্মীয় যদি নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক না হন, তাহলে তাদের যাকাত, উশর, সদকাতুল ফিতর, ওয়াজিব সদকা, ফিদিয়া, কাফফারা ও মানত দেওয়া যাবে এবং তাদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। হাদিস শরিফে রয়েছে, নিকটাত্মীয়দের দান করলে দ্বিগুণ সওয়াব হয়। প্রথমত, দানের সওয়াব এবং দ্বিতীয়ত, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার সওয়াব। যাকাত, ফিতরা, ফিদিয়া, কাফফারা ও মানত–সদকা নগদ টাকায় বা খাদ্যদ্রব্য এবং অন্য কোনো বস্তু, যেমন পোশাক, ঈদের বাজার ইত্যাদি কিনেও দেওয়া যায়। যাকাত এমনভাবে প্রদান করা উচিত, যাতে স্থায়ীভাবে দারিদ্র্য বিমোচন হয়। আত্মপ্রচার ও প্রদর্শনী কাম্য নয়।
যাকাত ও সদকায় অগ্রাধিকার প্রসঙ্গে আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘এমন অভাবী লোক, যারা আল্লাহর পথে নিজেদের নিয়োজিত রাখার কারণে (উপার্জনের জন্য) দুনিয়া চষে বেড়াতে পারে না। সম্ভাব্যতা ও আত্মমর্যাদার কারণে অনভিজ্ঞ লোকেরা তাদের অভাবহীন মনে করে। আপনি তাদের চিহ্ন দেখে চিনতে পারবেন। তারা মানুষের কাছে নির্লজ্জভাবে ভিক্ষা করে না। আর তোমরা যেকোনো উত্তম জিনিস ব্যয় করো, নিশ্চয় আল্লাহ–তাআলা সে বিষয়ে অবগত আছেন।’ (সুরা–২ বাকারা, আয়াত: ২৭৩)
জাকাত, সদকা ও ফিতরা দেওয়ার সময় গ্রহীতাকে তা জানানোর প্রয়োজন নেই। জাকাত গ্রহীতা যদি আত্মীয়স্বজন, আপনজন বা পরিচিত ও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি হন, তাহলে জাকাত ও ফিতরা উল্লেখ করাটা মোটেই সমীচীন নয়। কারণ, এতে গ্রহীতা অপমানিত, অসম্মানিত, বিব্রত ও অস্বস্তি বোধ করতে পারেন। অকারণে কাউকে অসম্মান করা বা কারও সম্মান হানি করা গুনাহের কাজ। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘সম্মান আল্লাহর জন্য, সম্মান রাসুল (সা.)–এর জন্য, সম্মান সব মুমিনের জন্য; কিন্তু মুনাফিকেরা তা জানে না।’ (সুরা–৬৩ মুনাফিকুন, আয়াত: ৮)
নারীদের প্রযোজ্য ক্ষেত্রে নিজেদের সোনা, গয়না, টাকাপয়সা ও সম্পদের যাকাত প্রদান করবেন এবং সদকাতুল ফিতরও আদায় করবেন। নারীর পক্ষে পিতা, ভ্রাতা, স্বামী, সন্তান বা অন্য কেউ আদায় করে দিলেও হবে। যেহেতু আর্থিক ইবাদতগুলো একজন অন্যজনের পক্ষ থেকে আদায় করতে পারেন। (দুররুল মুখতার)
আইএনবি/বিভূঁইয়া