সৈকতে জাগছে সাগরলতা, বাড়ছে লাল কাঁকড়ার দৌড়ঝাঁপ

1

কক্সবাজার: করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত ভ্রমণে চলছে নিষেধাজ্ঞা। সৈকতজুড়ে এখন কেবলই নির্জনতা। গত ১৮ মার্চ থেকে সাগরের ঢেউয়ের গর্জন ছাড়া আর কোনো কোলাহল নেই সৈকতে। সূত্র : বাংলা নিউজ

এমন নির্জনতা বহুদিন উপভোগ করেনি কক্সবাজারবাসী। যেন হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত। বালিয়াড়িতে মানুষের বিচরণ না থাকায় অবাধ ঘুরে বেড়াচ্ছে লাল কাঁকড়ার দল। অন্যদিকে ডালপালা মেলতে শুরু করেছে সাগরলতা। জমতে জমতে বড় হচ্ছে বালিয়াড়ি। এরমধ্যে একদম লোকালয়ের কাছে এসেই ডিগবাজিতে মেতেছে একদল ডলফিন।

সমুদ্রসৈকতে প্রকৃতির রাজ্যে এমন পরিবর্তন ইতিবাচকভাবে দেখছেন পরিবেশবিদেরা। তারা বলছেন, এসব প্রাণ-প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সৈকতের কিছু কিছু অংশে প্রকৃতিবান্ধব হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ জরুরি।

কক্সবাজারে পরিবেশ নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করেছে বিশ্বজিত সেন বাঞ্চু। বাঞ্চু বাংলানিউজকে বলেন, সমুদ্রসৈকতে মাটির ক্ষয়রোধ ও শুকনো উড়ন্ত বালুরাশি আটকে বালিয়াড়ি তৈরির মূল কারিগর হচ্ছে সাগরলতা। বালিয়াড়িকে সাগরের রক্ষাকবচও বলা হয়। কারণ ঝড়-তুফান, ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে কারণে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসের সময় উপকূলকে ভাঙনের কবল থেকে রক্ষা করে এসব বালিয়াড়ি। মানুষের কোলাহলমুক্ত সৈকত পেয়ে এখন আবার উঁকি দিচ্ছে সেই সাগরলতা। এটি পরিবেশের জন্য খুব ইতিবাচক।

লাল কাঁকড়ার দৌড়ঝাপ‘কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য একদিকে পর্যটন এবং মানুষের অতিরিক্ত চাপ অন্যদিকে দখল-দূষণের কারণে সমুদ্রসৈকত এখন বিপর্যস্ত। যে কারণে কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত অনেক বড় বড় বালিয়াড়ি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। সাগরে বেড়েছে ভাঙন।’ যোগ করেন তিনি।

তিনি বলেন, মাত্র এক দশক আগেও কক্সবাজার শহর থেকে টেকনাফ পর্যন্ত সৈকতজুড়ে গোলাপি-অতিবেগুনি রঙের ফুলে ভরা সাগরলতা দেখা যেত। যা পর্যটকদের কাছেও ছিল অন্য রকম আকর্ষণ। কিন্তু আমাদের অতি বাড়াবাড়ির কারণে আজ তা হারিয়ে গেছে। কিন্তু করোনা পরিস্থিতিতে সাগরের নির্জনতার সুযোগে সমুদ্রসৈকত তার নিজস্বতা ফিরে পেয়েছে।

কক্সবাজার পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আয়াছুর রহমান বলেন, সমুদ্রসৈকতে মানুষের অবাধ বিচরণের কারণে সেখানকার প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য এখন হুমকির মুখে। এক সময় সৈকতজুড়ে দেখা যেত লাল কাঁকড়ার দৌড়ঝাঁপ। সেই দৃশ্য এখন আমরা হারাতে বসেছি। আশার কথা হলো, অন্তত এই দুর্যোগময় মুহূর্তে হলেও প্রকৃতি তার নিজের পরিবেশ ফিরিয়ে পেয়েছে।

‘এতদিন পরে ডলফিনের ঝাঁক লোকালয়ের একদম কাছে এলো। এতেই আমাদের বুঝতে হবে, এতদিন মানুষের ভিড়ের কারণে আসার পরিবেশ পায়নি। আমাদের উচিত প্রাণ-প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য বাঁচানো। পর্যটনের স্বার্থে পুরো সৈকতে পারা না গেলেও সৈকতের বিশেষ বিশেষ অংশ যেন প্রকৃতিবান্ধব, পরিবেশবান্ধব রাখা হয় যাতে এসব প্রাণী নিজেদের মতো করে বাঁচতে পারে, সাগরলতা আপন বলয়ে বিস্তার ঘটতে পারে।’ যোগ করেন আয়াছুর রহমান।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, সৈকতের পরিবেশগত পুনরুদ্ধারে সাগরলতার মতো দ্রাক্ষালতা বনায়নের মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ফ্লোরিডা এবং অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় সৈকতের হ্যাস্টিং পয়েন্টসহ বিশ্বের বিভিন্ন সৈকতে বালিয়াড়ি সৃষ্টিতে সফল হয়েছেন বিজ্ঞানীরা। তাদের দেখানো পথে সৈকতের মাটির ক্ষয়রোধ ও সংকটাপন্ন পরিবেশ পুনরুদ্ধারে বিশ্বের দেশে দেশে কাজে লাগানো হচ্ছে সাগরলতাকে।

উন্নত বিশ্বের গবেষণালব্ধ ফলাফলে সাগরলতার মতো দ্রাক্ষালতা সৈকত অঞ্চলে পরিবেশগত পুনরুদ্ধার ও মাটির ক্ষয় রোধের জন্য একটি ভালো প্রজাতি বলে প্রমাণিত। সাগরলতা ন্যূনতম পুষ্টিসমৃদ্ধ বেলে মাটিতে বেড়ে উঠতে পারে। তার পানির প্রয়োজনীয়তাও কম হয়। উচ্চ লবণাক্ত মাটিও তার জন্য সহনশীল। এর শিকড় মাটির তিন ফুটের বেশি গভীরে যেতে পারে।

এটি দ্রুতবর্ধনশীল একটি উদ্ভিদ। বাইরের কোনো হস্তক্ষেপ না হলে লতাটি চারিদিকে বাড়তে থাকে এবং সর্বোচ্চ সামুদ্রিক জোয়ারের উপরের স্তরের বালিয়াড়িতে জাল বিস্তার করে মাটিকে আটকে রাখে। এরপর বায়ু প্রবাহের সঙ্গে আসা বালি ধীরে ধীরে সেখানে জমা হয়ে মাটির উচ্চতা বাড়ায়। এতে সাগরলতার ও সৈকতের মাটির স্থিতিশীলতা তৈরি হয়। সাগরলতার ইংরেজি নাম রেলরোড ভাইন, যার বাংলা শব্দার্থ করলে দাঁড়ায় রেলপথ লতা। আসলেই রেলপথের মতোই যেন এর দৈর্ঘ্য। একটি সাগরলতা ১শ ফুটেরও বেশি লম্বা হতে পারে। এর বৈজ্ঞানিক নাম Ipomea pes caprae.

কক্সবাজারের বিশিষ্ট পরিবেশ বিজ্ঞানী ড. আনসারুল করিম বাংলানিউজকে বলেন, কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত সমুদ্রের তীর ধরে ২০ থেকে ৩০ ফুট উঁচু পাহাড়ের মতোই বড় বড় বালির ঢিবি ছিল। এসব বালিয়াড়ির প্রধান উদ্ভিদ ছিল সাগরলতা। সাগরলতার গোলাপি-অতিবেগুনি রঙের ফুলে সৈকতে এক অন্য রকমের সৌন্দর্য তৈরি হতো। কিন্তু সাগরলতা ও বালিয়াড়ি হারিয়ে যাওয়ায় গত প্রায় তিন দশকে কক্সবাজার সৈকতের ৫শ মিটারের বেশি ভূমি সাগরে বিলীন হয়ে গেছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ ও বনবিদ্যা ইনস্টিটিউটের প্রফেসর ড. কামাল হোসেন জানান, কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত সমুদ্রসৈকতে গত প্রায় ২ দশক আগেও বড় বড় বালির পাহাড় বা বালিয়াড়ি দেখা যেত। আর এসব বালিয়াড়িকে ঘিরে সাগরলতাসহ নানা লতা-গুল্ম ও উদ্ভিদরাজি গড়ে উঠতো। এসব উদ্ভিদ কেন্দ্র করে গড়ে উঠতো স্বতন্ত্র প্রাণবৈচিত্র্যও। কিন্তু অপরিকল্পিত উন্নয়ন ও দখল-দূষণের কারণে সমুদ্রতীরের বালিয়াড়িগুলো এখন হারিয়ে যেতে বসেছে। ফলে সাগরলতাও এখন বিপন্ন হয়ে পড়েছে।

ঢাকার ইন্ডিপেন্ডেট বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর ও বিশিষ্ট পরিবেশ বিজ্ঞানী রাগিবউদ্দিন আহমদের মতে, সাগরলতা সৈকতের অন্য প্রাণী যেমন, বিভিন্ন প্রজাতির কাঁকড়া ও পাখির টিকে থাকার জন্যও খুব গুরুত্বপূর্ণ। সাগরলতার সবুজ পাতা মাটিকে সূর্যের কিরণ থেকে এমনভাবে রক্ষা করে, যাতে সূর্যের তাপ মাটি থেকে অতিরিক্ত পানি বাষ্পীভূত করতে না পারে। এতে মাটির নিচের স্তরের উপকারী ব্যাকটেরিয়াসহ অন্য প্রাণীর জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে।

বালিয়াড়ি ও সাগরলতা না থাকলে আরো অনেক প্রাণী পরিবেশ থেকে হারিয়ে যাবে মন্তব্য করে তিনি বলেন, কক্সবাজার সৈকতের সৌন্দর্যমানকে সুসজ্জিত করতে হলেও সাগরলতার দরকার। সমুদ্রসৈকত না থাকলে কক্সবাজারের পর্যটনশিল্পও টিকতে পারবে না। তাই পর্যটনের স্বার্থেও বালিয়াড়ি ও বালিয়াড়ি উদ্ভিদ রক্ষার মাধ্যমে কক্সবাজারের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের দরকার।