দেশের সর্বকনিষ্ঠ বীরশ্রেষ্ঠ

2

আইএনবি ডেস্ক: বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের মিছিলে যে সাত জনের আত্মত্যাগ ও বীরত্বে জাতি ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ খেতাবে ভূষিত করে মরণোত্তর সম্মান দিয়েছে, বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান তাদের অন্যতম একজন।

হামিদুর রহমান মুক্তিবাহিনীর সাহসী সদস্য হিসেবে যুদ্ধ করছিলেন সিলেট শ্রীমঙ্গল এলাকায়।  এখানে ধলই বিওপিতে ছিলো পাকিস্তানীদের শক্ত ঘাঁটি।  এ ঘাঁটি থেকে হানাদারদের হটানোর মিশনে ছিলেন তিনি।  একাত্তরের ২৮ অক্টোবর খুব ভোরে মুক্তিবাহিনী শুরু করল আক্রমন। চা বাগানের ভেতর হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে গেলেন হামিদুর তার দলের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কাইয়ুমের নির্দেশে একটি হালকা মেশিনগান সঙ্গে নিয়ে।  শত্রু ঘাঁটির একেবারে কাছে গিয়ে তিনি আকস্মিক হামলা চালালেন শত্রু দলের উপর। নিহত হল প্রতিপক্ষের অধিনায়কসহ কয়েকজন সেনা। শত্রু সেনারা পরিস্থিতি সামলে নিয়ে শুরু করল পাল্টা আক্রমন। কিন্তু হামিদুর রহমান পিছু হটলেন না। প্রাণপণে লড়াই চালিয়ে গেলেন। হঠাৎ একটি বুলেট এসে বিদ্ধ হল তার কপালে। হামিদুর রহমান বীরত্বের সাথে লড়াই করে শহীদ হলেন।

পাঁচ দিন অবিরাম যুদ্ধের পর মুক্ত হল ধলই বিওপি। হামিদুর রহমানের আত্মত্যাগ রচনা করল আমাদের মুক্তির পথ। মুক্তিযুদ্ধে বিরোচিত ভূমিকা ও আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরুপ তিনি সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা বীরশ্রেষ্ট খেতাবে ভূষিত হন। সুদীর্ঘ ৩৬ বছর পর তার দেহাবশেষ বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয় এবং ১১ ডিসেম্বর ২০০৭ তারিখে ঢাকার মিরপুরস্থ শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।

হামিদুর রহমান দেশের সর্বকনিষ্ঠ বীরশ্রেষ্ঠ।  তার জন্ম ১৯৫৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর উপজেলায়। বাবা আক্কাস আলী মণ্ডল আর মা কায়েদাতুন্নেসা। বাবা ছিলেন দরিদ্র দিনমজুর। এই সামান্য জীবন থেকেই অসামান্য হয়ে উঠলেন মাত্র ১৮ বছর বয়সের সদ্য কৈশোর পেরোনো হামিদুর রহমান। হয়ে উঠলেন বীরশ্রেষ্ঠ, দেশের গৌরব।

হামিদুর রহমানকে প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত পড়াশোনা করে বাবার সঙ্গে দিনমজুরিতে নেমে যেতে হয়। হামিদুর ভর্তি হন নৈশ স্কুলে। শত দারিদ্র্য ও কঠিন শ্রমের বিনিময়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। পশ্চিম পাকিস্তানের অন্যায় শোষণ আর অর্থনৈতিক বৈষম্য অনেকের মতো হামিদুর রহমানের মনেও রেখাপাত করেছিলো। জীবনের মায়া ত্যাগ করে তিনি মুক্তির জন্য যুদ্ধ করেছিলেন।

তিনি ছিলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সিপাহি। ১৯৭১ সালের ২ ফেব্রুয়ারি হামিদুর রহমান ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগ দেন। তখন সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ স্বাধিকার আন্দোলনে উত্তাল। ৭ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণকে পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ স্বাধীনতার ঘোষণা হিসেবেই নিয়েছিল, সারা দেশ তখন উত্তপ্ত। ২৫ মার্চ রাতে পূর্ব পাকিস্তানে শুরু হয়ে যায় গণহত্যা। সেই রাতেই ১ নম্বর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট আরও কিছু ইউনিট পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। হামিদুর রহমান ছুটে যান মায়ের সঙ্গে দেখা করতে, কিন্তু তিনি কোনো কালক্ষেপণ করেন না, আবার ফিরে আসেন মুক্তিযুদ্ধে। শুধু পরিবারের জন্য যে জীবনযুদ্ধ তিনি শুরু করেছিলেন, তা ছাপিয়ে তার যুদ্ধ শুরু হয় দেশমাতৃকার জন্য।

সিপাহি হামিদুর রহমান মাত্র ১৮ বছরের জীবনে হামিদুর সাহসিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন, রক্তের অক্ষরে বাংলাদেশের ইতিহাসে লিখে গেলেন নাম। সহযোদ্ধারা চোখের জলে তাঁকে সমাহিত করেছিল ত্রিপুরা রাজ্যের আমবাসা গ্রামে।রাইজিংবিডি.কম

আইএনবি/বিভূঁইয়া