এমডি বাবুল ভূঁইয়ার লেখা সমসাময়িক গল্প ‘স্মৃতির পাতায় অশ্রু ভেজা’

19

বিনোদন ডেস্ক: দেশের নতুন প্রজন্মের ক্ষুরধার লেখক ও সাংবাদিক এমডি বাবুল ভূঁইয়ার লেখা ‘ভালোবাসার নীল কস্ট’, ‘ঠিকান বিহীন জীবন’, ‘অনুভূতি পালিয়েছে’, ‘একটি ফোন কল’, ‘মা এখনও কাঁদে’ সমসাময়িক গল্পসহ অসংখ্য বই ইতমধ্যে প্রকাশ হয়েছে।

 

 

এ বিষয়ে আমাদের প্রতিবেদকের সাথে মুঠো ফোনে কথা হয় তরুন এই লেখক সাংবাদিক বাবুল ভূঁইয়ার সাথে। তিনি জানান, ইতিমধ্যে তার লেখা অনেক গুলো গল্প প্রকাশনার পথে…। ‘প্রেতাত্মা’ নামে শিশুদের জন্য একটি ভৌতিক গল্পও রয়েছে। আসছে অমর একুশে বই মেলায় তার কয়েকটি বই প্রকাশ পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আমরা তার ফেইসবুক ওয়াল থেকে ‘স্মৃতির পাতায় অশ্রু ভেজা’ লেখার দুটি পর্ব হুবুহু তোলে ধরছি-

আমরা আমাদের জীবনে কোন কিছুর মূল্য কখনই বুঝতে পারি না যতক্ষণ না তা স্মৃতিতে পরিণত হয়। মাঝে মাঝে অতীতে ফেলা আসা শৈশব এবং কিশোরের অনেক স্মৃতিই চোখের সামনে ভেসে উঠে। আবার কিছু ম্মৃতি মনে পরে নিজের অজান্তে চোখের কোনে পানি চলে আসে। আমাদের সবার জীবনেই কিছুনা কিছু স্মৃতি জড়িয়ে আছে তা লিখে হয়তো শেষ করা যাবে না। আমার জীবনেও অনেক স্মৃতি আছে, সেই স্মৃতি গুলো কখনো মনে করে আবার কখনো কর্ম ব্যস্ততার ভিড়ে ভূলে গিয়ে জীবন অতিবাহিত করতে হচ্ছে।

এইতো কয়েকদিন আগের ঘটনা। হঠাৎ করে আমার ফেইসবুকের বিভিন্ন পোস্টে লাইক করছে এমনকি কমেন্টও করছে নীলা নামে একটি আইডি থেকে। অথচ নীলা নামে কোন ফ্রেন্ড আমার সাথে এড নেই। বাধ্য হয়ে নীলার প্রোফাইলে ডোকতে গেলাম। কিন্তু প্রোফাইল লক করে রেখেছে। তার প্রোফাইলে দেওয়া দুটি বাচ্চার ছবি। তাদের ছবির সাথে আমার কিশোর জীবনে ফেলে আসা নীলার সাথে অনেকটা মিল আছে। আচমকা নিজের অজান্তে হৃদয়ে কম্পন চলে আসলো। কতো স্বপ্ন আর কতো স্মৃতি মনে পড়লো। আমার কয়েকটি পোস্টে নীলা কমেন্টও করেছে। কেমন আছি জানতে চাইছে। আমি উত্তরে বলেছি আপনাকে চিনতে পারছিনা, যদি পারেন ম্যাসেঞ্জারে আসতে পারেন…।

তার কিছুদিন পর আমাকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছে। আমি নীলার রিকোয়েস্ট গ্রহন করে তার আইডিতে ডোকে খোঁজতে লাগলাম আমার কিশোর জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়া সেই নীলাকে। কিন্তু কোথাও আমার কিশোর জীবনের সাথে মিশে থাকা সেই নীলার একটা ছবিও খোঁজে পেলাম না। কর্মব্যস্ততার ভিড়ে আবারও নীলার কথাটা মাথা থেকে কিছু সময়ের জন্য সরে গিয়েছিল। পুণরায় আবার আমার পোস্টে কমেন্ট করলো স্যার কেমন আছেন? বুঝতে আর বাকী রইলোনা । আমি যেই নীলার কথা ভাবছি সে-ই সেই নীলা। বাধ্য হয়ে একপর্যায়ে নীলার ম্যাসেঞ্জারে লিখলাম কে আপনি? দুদিন পর আমার লেখাটা সে দেখলো। কিন্তু কোন রিপ্লাই দেয়নি। তখন সাহস করে আমি ম্যাসেঞ্জারে ফোন দিতে অপর প্রান্ত থেকে বললো হ্যালো…। আমি চিনে ফেললাম..। কোন বাহানা না করে বললাম কেমন আছো? উত্তরে বললো চিনতে পারছেন তাহলে…? সেই অতীত আমার ভিতরে দ্বিতীয় হৃদয়ের মত স্পন্দিত হলো!

আমি আমাদের অতীত থেকে আমার জীবনের কিছু কথা বলছি। অপর প্রান্ত থেকে নীলা কাঁদছে সেটা আমি বুঝতে পারছি। কথার ফাঁকে জেনে নিলাম তার ছেলে-মেয়ে কয়জন। সে-ও আমার বউ, ছেলের কথা জানতে চাইলো। প্রায় পনেরো বছর পর নীলার সাথে কথা হচ্ছে। অতীতের একটি ঘটনা নীলাকে মনে করিয়ে দিতেই সে বললো আপনার সবকিছু তাহলে মনে আছে ..? প্রতিত্তুরে বললাম, বছরের পর বছর যেতে যেতে স্মৃতিগুলো হয়তো দুর্বল হয়ে যেতে পারে কিন্তু সেগুলো কোনদিনও বৃদ্ধ হবে না এমনকি ভূলাও যায়না।

নীলা আমার কথা শুনে চুপ করে আছে। বুঝতে পারলাম অতীতকে মনে করে তার মন খারাপ হয়ে গেছে । সে ভারী কন্ঠে বললো এই দুনিয়ার কিছু মানুষ স্বার্থপর এবং বড়ই বেঈমান। আমি তর্কে না জড়িয়ে কথার প্রসঙ্গ ঘুড়িয়ে দিয়ে তার ছোট বোন নীরার কথা জানতে চাইলাম। নীরাকে আমি অনেক ছোট দেখেছি। জানতে পারি নীরার বিয়ে হয়েছে। তার একটি ছেলে আছে কিন্তু হঠাৎ স্ট্রোক করে নীরার স্বামী মারা গিয়েছে। কথাটা শুনেই আমার মনটা খারাপ হয়ে গেছে। জানতে চাইলাম নীরাকে কি আবার বিয়ে দেওয়া হয়েছে কিনা? নীলা বললো বিয়ে দেওয়ার জন্য তাদের পরিবার থেকে অনেক চেস্টা করা হয়েছে। নীরা আবার বিয়ে করতে কিছুতেই রাজি হচ্ছে না। পলকের স্মৃতি নিয়ে নীরা তার জীবনটা কাটিয়ে দিতে চায়। পলক নীরার স্বামীর নাম। নীরার ছেলেটা স্কুলে পড়ে। সেও পূণরায় কলেজে ভর্তি হয়ে লেখাপড়া করছে। এরই মধ্যে আমার মোবাইলে জরুরী একটা ফোন আসায় নীলার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ফোন কেটে দিলাম।

পরেরদিন নীলার সাথে কথা বলার একপর্যায়ে জানালো আমার কথা নীরাকে বলেছে। সে আমাকে ফেইসবুকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছে। আমি যেনো তার রিকোয়েস্ট গ্রহন করি। নীরার ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট আমি গ্রহন করে তার ফেইসবুক আইডিতে ডোকে নীরার অনেক আবগেময় কবিতা লেখা গুলো পড়ে মনটা আরো খারাপ হয়ে গেলো। নীরার আইডিতে তার স্বামীর অনেক স্মৃতি খুব যত্ন করে রেখেছে। তাকে নিয়ে অনেক কবিতাও লিখেছে। নীলার সাথে যখন আমার কথা হয় তখন আমি অফিসিয়াল কাজে কুমিল্লায় ছিলাম। যখন ঢাকায় উদ্দেশ্য রওয়ানা হই তখন নানা স্মৃতি মাথায় ঘুড়পাক খাচ্ছে। বিশেষ করে নীরার কথা মনে পড়ছে। অল্প বয়সে সে তার স্বামীকে হারিয়েছে। সত্যিই মানুষের জীবনে মিষ্টি, মধুর, তিক্ত সবরকম স্মৃতির ভার বহন করেই সামনের পথে এগিয়ে চলতে হয়। প্রত্যেকটি মানুষের জীবনেই স্মৃতির মাহাত্ম্য অপরিসীম । আবার এমনও কিছু মানুষ আছেন যাঁরা স্মৃতিকে আঁকড়ে ধরেই সারাজীবন কাটিয়ে দিয়ে থাকেন। মনে হচ্ছে নীরাও তাই করবে।

গাড়িতে বসে ভাবছি ছেলেবেলার স্মৃতি ,স্কুলের আনন্দমুখর দিনের স্মৃতিগুলি, ভালোবাসা স্মৃতি আরও কত স্মৃতি এমন আছে যা প্রতি মুহূর্তে মনের মণিকোঠায় সঞ্চিত হয়ে থাকে। স্মৃতি আছে বলেই বুঝি নীরার মনে তার স্বামীর ভালোবাসা এখনো বেঁচে আছে । সত্যিই স্মৃতি হল একটি পরিপূর্ণ উদ্যানের মতো। সেই উদ্যানে নিয়মিতভাবে মনোরম ফুল ফুটিয়ে আক্রমণাত্মক আগাছাগুলি উৎখাত করে দেয়।

কলেজে লেখাপড়া করার সময় আমি রাজনীনিতে জড়িয়ে ছিলাম। নীলা সেটা মোটেই পছন্দ করতোনা। সে একদিন আমাকে বলেছিলো-
আকাশ তোমাকে একটা কথা বলি। আমি জানি তুমি শোনবেনা তবুও বলছি। আমাদের জীবনটা খুব ছোটো তাই প্রাণভরে বাঁচো। ভালোবাসা বিরল একে আঁকড়ে ধরো, রাগ বড় খারাপ তাকে ছুঁড়ে ফেলে দাও, ভয় অতি ভয়ঙ্কর তার মুখোমুখি হও, স্মৃতিগুলি বড়ই মধুর মনের মাধুরি মিশিয়ে লালন কর। নীলার সেদিনে কথা গুলো তেমন আমলে নেইনি এমনকি বুঝতেও পারিনি কেন বলছে। আজ নীলার সেই কথা গুলো খুব ভালোভাবে বুঝতে পারছি। সে আমাকে খুব ভালোবাসতো। আমি তার ভালোবাসা বুঝতে পারিনি..। নিজেকে বড়ই অপরাধী মনে হচ্ছে। সেদিন যদি জানতে চাইতাম কথা গুলো কেনো বলেছিলো তাহলে আজকে আমাকে এতো কস্ট যন্ত্রণা সহ্য করতে হতোনা। নীলাকেও কাঁদতে হতোনা…। এইসব ভাবতে ভাবতে আমি এক অজানা স্মৃতিতে হারিয়ে গিয়েছিলাম। সহকর্মীর ডাকে স্মৃতি থেকে ফিরে আসলাম। কখন ঢাকায় চলে আসছি টেরই পাইনি।
চলবে..